যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া ইরান এবার যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে পাঁচ দফা ‘অঘোষিত শর্ত’ জুড়ে দিয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবের জবাবে তেহরান ঘুরিয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি বিলোপ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ—এমন কঠিন শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে ইরান।
কূটনৈতিক দাবায়ু যুদ্ধ
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলা এই যুদ্ধ এখন কূটনৈতিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠানোর পর ইরান চুপ করে বসে থাকেনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরোক্ষ আলোচনার মধ্য দিয়ে ইরান তাদের পাল্টা শর্তগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, এসব শর্ত মানা মানে ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং ‘সম্মানজনক সমাধান’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই কৌশল বেশ স্মার্ট। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যতটা দুর্বল নয়, সাংবাদিক বৈঠকে ততটাই আক্রমণাত্মক। যুদ্ধবিরতির নামে তারা আসলে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন কাঠামো চেয়ে বসেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের শর্তগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে আঘাত করছে।
ইরানের পাঁচ দফা: কী চায় তেহরান?
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্তগুলো নিম্নরূপ:
-
স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: যুদ্ধ যেন আর কখনো শুরু না হয়, তার ‘শক্তিশালী নিশ্চয়তা’ দিতে হবে। শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনো সামরিক হুমকি না দেয়, সেই গ্যারান্টি চায় ইরান।
-
মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ: পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সামরিক স্থাপনা আছে, যেগুলো ইরানের জন্য ‘কাঁটার মতো’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
-
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ: যুদ্ধের কারণে ইরানের জনজীবন, পরিকাঠামো ও তেল শিল্পে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘পূর্ণ ক্ষতিপূরণ’ দিতে হবে। এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কোটি কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
-
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: বিশ্বের তেল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হরমুজ প্রণালির ওপর নতুন আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এই ব্যবস্থায় প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ মূলত ইরানের হাতে থাকবে। বর্তমানে এই কৌশলগত জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
-
সংবাদমাধ্যমের বিচার: ইরানের প্রতি ‘বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যম’-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ইরানের হাতে তুলে দিতে অথবা তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই শর্তটিকে পর্যবেক্ষকেরা ইরানের ‘নিরাপত্তা বুলেট’ হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তারা পশ্চিমা গণমাধ্যমের সমালোচনার জবাব দিতে চায়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: অসম্ভব সমীকরণ?
ইরানের এই শর্তগুলো প্রকাশের পর ওয়াশিংটনে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘এগুলো অত্যন্ত অবাস্তব দাবি। আমরা কখনো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতে পারি না।’ অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে দেওয়া মানে ইসরায়েলের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ তৈরি করা।
রাশিয়া ও চীন যদিও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, ইরানের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝার মতো, কিন্তু শর্তগুলো ‘বাস্তবসম্মত’ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইরানের পাল্টা শর্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও তা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, সেটাই এখন প্রধান প্রশ্ন। ট্রাম্প প্রশাসন আগেই জানিয়ে দিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলতে থাকবে, কূটনৈতিক ফল না পাওয়া পর্যন্ত। অপরদিকে তেহরান বলছে, তাদের শর্ত না মানলে ‘আলোচনার টেবিল ভাঙবে’।


