টানা দরপতন আর লেনদেনে খরা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরবে—এমন প্রবল প্রত্যাশায় দিন গুনছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। সাম্প্রতিক সময়ে সূচকের অস্থিরতা ও আস্থার সংকটে বাজার স্থবির হয়ে পড়লেও, সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের ছুটির পর নতুন তারল্য প্রবাহে প্রাণ ফিরে পাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
কেন এই বর্তমান মন্দাভাব?
পুঁজিবাজারের দীর্ঘ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উৎসবের আগে বাজারে এক ধরনের বিক্রয় চাপ তৈরি হয়। এবারের চিত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ঈদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খরচ মেটাতে পোর্টফোলিও থেকে শেয়ার বিক্রি করে নগদ টাকা উত্তোলন করেছেন। ফলে বাজারে শেয়ারের যোগান বাড়লেও সেই তুলনায় ক্রেতা না থাকায় সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল ঈদের খরচ নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ (Wait and See) নীতি কাজ করছে। অনেক বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও এই সময়ে নতুন করে বড় কোনো বিনিয়োগে না গিয়ে সাইডলাইনে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকেছে।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের পর বাজারের চিত্র বদলে যাওয়ার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, উৎসবের ছুটি শেষে বিনিয়োগকারীরা আবার সক্রিয় হন এবং বাজারে নতুন করে তহবিল প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানি তাদের ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি কোম্পানিগুলোর মুনাফা সন্তোষজনক হয়, তবে মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের প্রতি ঝোঁক বাড়বে সাধারণ মানুষের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র একজন সদস্য বলেন, “পুঁজিবাজার অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। যখন সবাই বিক্রি করে, তখন সূচক পড়ে যায়। কিন্তু এখন অনেক ভালো শেয়ারের দাম ফ্লোর প্রাইস বা তার কাছাকাছি অবাস্তব কম মূল্যে রয়েছে। বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা ঈদের পর এই সুযোগটিই নেবেন।”
বাজার পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক:
-
বিক্রয় চাপ: ঈদের বোনাস বা জমানো টাকার পরিবর্তে শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
-
তারল্য সংকট: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পুঁজিবাজার থেকে কিছু টাকা ব্যাংক আমানতের দিকে সরে গেছে।
-
প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তা: বড় ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বড় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
-
ইতিবাচক পূর্বাভাস: ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই ঈদের পরবর্তী দুই সপ্তাহে বাজারে গড় লেনদেন ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
আস্থার সংকট বনাম নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা
বাজারের এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কারসাজি রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল সূচক বাড়ানো নয়, বরং টেকসই বাজারের জন্য ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির আইপিও (IPO) বাজারে আনা জরুরি।
অনেক বিনিয়োগকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, বাজার যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। তবে আশার কথা হলো, ডিএসই ও সিএসই’র শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঈদের পর যখন অফিস-আদালত পূর্ণোদ্যমে চালু হবে, তখন পুঁজিবাজারেও এর ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটবে।


