TT Ads

ঈদ মানেই পোলাও-কোরমা, রোস্ট-রেজালার আয়োজন। স্বাদের এই আসরে অনেকেই লোভ সামলাতে পারেন না, খেয়ে ফেলেন বাড়তি মাংস। কিন্তু একটু বেশিই যদি পাতে পড়ে, তাহলে শরীর কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্কেত দিতে শুরু করে।

বাগেরহাট ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. সাকিয়া হক জানিয়েছেন, হঠাৎ করে অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর শরীরে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় এবং তা সামলানোর উপায় কী।

ঈদ, পূজা কিংবা বছরের অন্য কোনো বিশেষ উৎসব—বাংলার ঘরে ঘরে তখন মাংসের নানা পদ রান্না হয়। মুখরোচক এসব খাবারের সুবাসে মন ভরে যায়। কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তে স্বাস্থ্যের কথা কি আমরা ভুলে যাই?

দীর্ঘমেয়াদে লাল মাংসের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও, উৎসবের আমেজে হুট করে একটু বেশি মাংস খেয়ে ফেলার তাৎক্ষণিক প্রভাব সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। ডা. সাকিয়া হকের মতে, এই অজ্ঞতাই বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি দুর্বল।

মাংস হজমের সময় ও শরীরের প্রতিক্রিয়া:

গরুর মাংস বা খাসির মাংস—উৎসবের পদে সাধারণত বেশি তেল-মসলা ও চর্বি যুক্ত থাকে। ডা. সাকিয়া হক ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘মাংস সাধারণত হজম হতে সময় নেয়। কিন্তু যখন তা অতিরিক্ত তেল ও মসলায় রান্না করা হয়, তখন তা ভেঙে হজম হতে আরও বেশি সময় লাগে। আমাদের পাকস্থলী তখন অতিরিক্ত পরিশ্রম করে।’

এই সময় শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) দ্রুত তাপ উৎপন্ন করতে থাকে। তাই খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীর গরম লাগা বা ঘাম হওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। অনেকে আবার একে ‘উষ্ণতা’ বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু এটি মূলত শরীরের ভেতরের ভারসাম্য হারানোরই বহিঃপ্রকাশ।

ভারী লাগা ও ক্লান্তি: কেন হয়?

অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর আরেকটি সাধারণ অভিযোগ হলো শরীর ভারী হয়ে যাওয়া। চিকিৎসকের ভাষায়, ‘একে আমরা বলি ফুড কমা। শরীর তখন এত বেশি শক্তি হজমের পেছনে ব্যয় করে যে অন্য কাজে শক্তি দেয় না। ফলে মনে হয়, যেন অলসতা ঘিরে ধরেছে, শক্তি হারিয়ে ফেলছি।’

অনেক সময় এই অবস্থা চরমে গেলে বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা বা অম্বলের সৃষ্টি হতে পারে। ডা. হক জানান, অনেকে মনে করেন একদিন বেশি খেলে ক্ষতি নেই, কিন্তু শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবেই চাপ নেয়।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কাদের বেশি?

উৎসবের দিনে সুস্থ মানুষ সাময়িক অস্বস্তি অনুভব করলেও, যারা ইতিমধ্যেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই ‘একটু বেশি’ মাংস মারাত্মক আকার নিতে পারে।

ডা. সাকিয়া হক সতর্ক করে বলেন, ‘যাদের ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা আছে, তারা তো আছেনই, পাশাপাশি যাদের কিডনি বা লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত মাংস বিষক্রিয়ার মতো কাজ করতে পারে। কারণ অতিরিক্ত প্রোটিন ও চর্বি একসঙ্গে গিয়ে লিভারের ওপর চাপ বাড়ায়।’

চিকিৎসকের পরামর্শ ও করণীয়:
উৎসবের আনন্দ নষ্ট না করে কীভাবে সুস্থ থাকা যায়, তার কিছু টিপস দিয়েছেন ডা. সাকিয়া হক।

  • প্রথমত, অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পাতে যেন শুধু মাংস না থাকে, তার সঙ্গে শসা, টমেটো বা সালাদ রাখা জরুরি।

  • দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত মাংস খেয়ে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে পানি পান না করে বরং একটু হাঁটাহাঁটি করতে হবে।

  • তৃতীয়ত, হজমে সাহায্য করে এমন কিছু ভেষজ, যেমন দারুচিনি বা এলাচের চা খেতে পারেন।

  • চতুর্থত, পরবর্তী ভারী খাবারের আগে দীর্ঘ বিরতি রাখতে হবে, যাতে শরীর হজমের কাজ শেষ করে নেয়।

মূল তথ্য (প্রতিক্রিয়ার তালিকা):

  • শারীরিক প্রতিক্রিয়া ১: অতিরিক্ত মাংস খেলে বিপাকক্রিয়া দ্রুত তাপ উৎপন্ন করে, ফলে শরীর গরম হয় ও ঘাম দেখা দেয়।

  • শারীরিক প্রতিক্রিয়া ২: হজমে সময় বেশি লাগায় পাকস্থলী ভারী থাকে এবং ক্লান্তি অনুভূত হয়।

  • শারীরিক প্রতিক্রিয়া ৩: রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা গাঁটে ব্যথার কারণ।

  • শারীরিক প্রতিক্রিয়া ৪: যাদের গলব্লাডার বা লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত চর্বি বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

উৎসব মানেই খুশি, আর খুশি মানেই স্বাস্থ্যকর জীবন। ডা. সাকিয়া হকের ভাষ্যমতে, ‘আমরা মনে করি একদিন বেশি খেলে ক্ষতি হবে না, কিন্তু সেই একদিনের অসাবধানতা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী রোগ ডেকে আনতে পারে।’

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *