মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার এনার্জি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইউরোপের পাইকারি গ্যাস বাজারে দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) এই ঘোষণার পর ডাচ টিটিএফ হাবের দাম ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছেছে।
কাতার এনার্জি, যা বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, রাস লাফান শিল্পনগরীতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করেছে। এই স্থাপনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে এশিয়া ও ইউরোপে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাঠানো হয়।
কাতার এনার্জির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পনগরীতে সামরিক হামলার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে।” পুনরায় চালু করার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি, যা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা থেকে উদ্ভূত, ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং কাতার-সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমস্ত এলএনজি রপ্তানি হয়।
ইরানের হামলা কাতারের অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জলের ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট হতে পারে।
ইউরোপ, যা ২০২২ সালের পর রাশিয়ান পাইপলাইন গ্যাস থেকে মুখ ফিরিয়ে কাতারের এলএনজির উপর নির্ভরশীল হয়েছে, এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কাতার ইউরোপের এলএনজি আমদানির ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে। সোমবার সকালে দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও, উৎপাদন বন্ধের খবরে তা ৫০ শতাংশে পৌঁছে।
ডাচ টিটিএফ, যা ইউরোপের বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত, ফ্রন্ট-মান্থ চুক্তির দাম ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি এমডব্লিউএইচ হয়েছে, যা প্রায় ১৫.৯২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউয়ের সমান। এই দামবৃদ্ধি গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
ডাচ টিটিএফ হাব ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের মূল নির্ধারক। এটি একটি নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ-চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সরবরাহের ঘাটতি এই প্রক্রিয়াকে অস্থির করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে, যা ইউরোপের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
এশিয়া, যা কাতারের এলএনজির প্রধান গ্রাহক,ও এই সংকটে প্রভাবিত। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা বিশ্বব্যাপী দামবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতে, হরমুজ প্রণালী অবরোধ অব্যাহত থাকলে এশিয়া ও ইউরোপে দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানিকারকরা, যেমন চেনিয়ার এনার্জি, এতে লাভবান হচ্ছে, তাদের শেয়ার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবকে তুলে ধরেছে। তেলের দামও ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো বিকল্প সরবরাহ খুঁজছে, কিন্তু শীতকালে এটি চ্যালেঞ্জিং।


