জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজধানীর চানখাঁরপুলে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে। সোমবার এই রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল, যা দেশের ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়মুক্তির যুগের অবসানের সংকেত দিচ্ছে।
এই ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত হয়, যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল দেশ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, চানখাঁরপুল এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের অত্যধিক বলপ্রয়োগের ফলে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা দায়ের হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, আসামিরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে অপরাধ সংঘটিত করেছেন।
মামলার বিবরণে উঠে এসেছে যে, হাবিবুর রহমান তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সরাসরি দায়িত্বশীল ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া, অন্য আসামিদের মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় মোট আটজন আসামি ছিলেন, যাদের মধ্যে চারজন—হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল এবং ইমরুল—পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। বাকিরা কারাগারে থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছিলেন। প্রসিকিউশন ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করেছে, যার মধ্যে শহীদ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খানের সাক্ষ্য ছিল সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী। আসামিপক্ষও সাক্ষী উপস্থাপন করলেও, ট্রাইব্যুনাল প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এটি দ্বিতীয় রায়। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যখন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হয়ে পাঁচ বছরের সাজা পান। এই রায়গুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্দোলনের সময়কার সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের প্রক্রিয়া গতি পাচ্ছে। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন রায়গুলো দেশে ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে, কিন্তু পলাতক আসামিদের ধরা এবং সাজা কার্যকর করা চ্যালেঞ্জিং হবে।
এই ঘটনার পটভূমিতে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে স্মরণ করা যায়, যা কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই সময় পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর হাতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। চানখাঁরপুলের ঘটনা ছিল তারই একটি করুণ অধ্যায়, যেখানে নিরস্ত্র যুবকরা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। শহীদদের পরিবারগুলো এখনও সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন, এবং এই রায় তাঁদের জন্য সান্ত্বনা হলেও, পূর্ণ ন্যায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।


