স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার যুগে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা এখন বড় আতঙ্কের নাম। সেই উদ্বেগ দূর করতে বড় পদক্ষেপ নিল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ।
১২ বছর বয়সী বা তার কম বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ‘প্যারেন্ট-ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট’ চালু করছে মেটার মালিকানাধীন এই প্ল্যাটফর্ম। নতুন এই ব্যবস্থায় অভিভাবকদের অনুমতি ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শিশুরা কোনোভাবেই অ্যাপটির মূল সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি ।
শিশু-কিশোরদের অনলাইন নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। পড়াশোনা থেকে বিনোদন—সবকিছুরই কেন্দ্রবিন্দু এখন হাতের মুঠোয়। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানামুখী শঙ্কা। কে কার সঙ্গে কথা বলছে, কাদের গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে—এসব নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই বাবা-মায়ের।
সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই হোয়াটসঅ্যাপ এনেছে নতুন এই ফিচার। সম্প্রতি এক ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারা জানিয়েছে, পরিবার ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে ১৩ বছরের নিচের শিশুরা নিরাপদে মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করতে শেখে ।
কীভাবে কাজ করবে এই বিশেষ অ্যাকাউন্ট?
শিশুর জন্য এই অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে গেলে একসঙ্গে দুটি ফোনের প্রয়োজন হবে—একটি শিশুর এবং অন্যটি অভিভাবকের। প্রথমে শিশুর ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড করে ‘ক্রিয়েট এ প্যারেন্ট-ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট’ অপশনটি বেছে নিতে হবে। এরপর একটি কিউআর কোড স্ক্যান করে অভিভাবকের ফোনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে একটি ছয় অঙ্কের পিন কোড (প্যারেন্ট পিন) সেট করে দিলেই অ্যাকাউন্ট চালু হয়ে যাবে ।
এই পিনই মূল চাবিকাঠি। এই পিন জানা না থাকলে শিশু কোনো নতুন কন্টাক্ট যুক্ত করতে পারবে না, কোনো গ্রুপে জয়েন করতে পারবে না, এমনকি অ্যাকাউন্টের কোনো সেটিংস বদলাতেও পারবে না ।
কী কী সুবিধা পাবে শিশুরা?
নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিশুদের জন্য অ্যাপটির অভিজ্ঞতা কেমন হবে, সেটাও ভেবে রেখেছে হোয়াটসঅ্যাপ। এই বিশেষ অ্যাকাউন্টে শিশুরা শুধু মেসেজ ও ভয়েস বা ভিডিও কলের সুবিধা পাবে। কিন্তু সাধারণ অ্যাকাউন্টের মতো সব ফিচার তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, এমন সব ফিচার সরিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন—
-
মেটা এআই ও চ্যানেল: শিশুরা কোনোভাবেই মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল বা পাবলিক চ্যানেল ব্যবহার করতে পারবে না ।
-
স্ট্যাটাস ও লোকেশন শেয়ারিং: স্ট্যাটাস দেওয়া, ভিউ-ওয়ান্স মেসেজ (যে বার্তা একবার দেখার পর মুছে যায়), চ্যাট লক বা লোকেশন শেয়ার করার সুবিধা থাকছে না ।
-
অচেনা কন্টাক্ট থেকে সুরক্ষা: কোনো অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ আসলে সেটি ‘রিকোয়েস্ট’ ফোল্ডারে চলে যাবে। ওই ফোল্ডার খুলতে গেলেই প্রয়োজন হবে অভিভাবকের পিন। সেই রিকোয়েস্ট অনুমোদন করলেই কেবল শিশুটি ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে পারবে ।
-
গ্রুপে যুক্ত হওয়ার নিয়ন্ত্রণ: একইভাবে, কোনো গ্রুপে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ এলেও সেটি পিনের আড়ালে চলে যাবে। অভিভাবক চাইলে গ্রুপের সদস্য ও অ্যাডমিনের তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন ।
গোপনীয়তা ও ভবিষ্যৎ:
শঙ্কা দূর হচ্ছে, কিন্তু গোপনীয়তা কি হারিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাবে হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, এই অ্যাকাউন্টেও এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন (দুই প্রান্তে বার্তা সুরক্ষিত রাখার প্রযুক্তি) বহাল থাকবে। অর্থাৎ অভিভাবক শিশুর কারও সঙ্গে কী বার্তা বিনিময় হচ্ছে, তা পড়তে পারবেন না। তারা শুধু দেখতে পাবেন, শিশু কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ শুরু করেছে বা নতুন কাউকে অ্যাড করেছে কি না ।
শিশুর বয়স যখন ১৩ বছর হবে, তখন তাকে জানিয়ে দেওয়া হবে যে তার অ্যাকাউন্ট এখন সাধারণ অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করা যাবে। তবে অভিভাবক চাইলে এই রূপান্তর আরও ১২ মাস পিছিয়েও দিতে পারবেন ।
মূল তথ্য (এক নজরে):
-
কার জন্য: ১৩ বছরের নিচের শিশু (যে দেশে হোয়াটসঅ্যাপের ন্যূনতম বয়স ১৩, সেখানে এই নিয়ম প্রযোজ্য) ।
-
কী নিয়ন্ত্রণ করা যাবে: কে শিশুর সঙ্গে কথা বলবে, কোন গ্রুপে যুক্ত হবে, কী ধরনের রিকোয়েস্ট আসছে ।
-
কী পাওয়া যাবে না: মেটা এআই, স্ট্যাটাস, লোকেশন শেয়ারিং, ভিউ-ওয়ান্স মেসেজ, চ্যাট লক, পাবলিক চ্যানেল ।
-
কীভাবে কাজ করবে: অভিভাবক ৬ অঙ্কের পিন সেট করে দেবেন, যা জানা না থাকলে শিশু সেটিংস বদলাতে পারবে না ।
-
নিরাপত্তা: এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন থাকবে, অভিভাবক বার্তা পড়তে পারবেন না ।
-
রোলআউট: আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে সারা বিশ্বে এই সুবিধা চালু হবে ।
ডেনমার্ক, জার্মানি, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যখন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিয়ে কঠোর নিয়ম আনার কথা ভাবছে, তখন হোয়াটসঅ্যাপের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।


