যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিলে ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত নিয়ে সমঝোতায় যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিবিসি-র সাক্ষাৎকারে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভাঞ্চি এই ঘোষণা দেন। ওমানে চলমান পরোক্ষ আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই উক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিউক্লিয়ার সংকটে নতুন মোড় ঘুরিয়েছে, যা বিশ্বশান্তির পথে একটি সম্ভাব্য দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাস যেন একটি জটিল রহস্যময় উপন্যাস, যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে বিশ্বাসঘাতকতা, আশা এবং হুমকির ছায়া পড়ে। ২০১৫ সালের জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি ছিল এই উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি শক্তির সঙ্গে ইরানের এই চুক্তিতে তেহরান তার নিউক্লিয়ার কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বাড়ে, অর্থনীতি স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ে—মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া, বেকারত্ব বাড়ে এবং জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে।
এখন, ২০২৬ সালে, যখন বিশ্ব রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ছায়ায় কাঁপছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-হামাস সংঘর্ষের আগুন জ্বলছে, ইরানের এই প্রস্তাবটি একটি আশার রশ্মি। তাখত-রাভাঞ্চির সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান তার ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে পাতলা করে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে প্রায় ৪০০ কিলোগ্রামের মজুত। এটি অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য চিন্তার কারণ। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘আন্তরিকতা’ দেখায়—অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়—তাহলে চুক্তির পথে অগ্রগতি সম্ভব। “গোলার্ধ আমেরিকার হাতে,” তিনি বলেন, যা ওমানে ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পরোক্ষ আলোচনার দ্বিতীয় রাউন্ডের (১৭ ফেব্রুয়ারি) পটভূমি তৈরি করছে।
এই বক্তব্যের পেছনে ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপও লুকিয়ে আছে। দেশের অর্থনীতি এখনও নিষেধাজ্ঞার শিকার—তেল রপ্তানি সীমিত, ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ৮০ শতাংশ কমেছে গত পাঁচ বছরে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা সরকারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। তাখত-রাভাঞ্চির মতো কূটনীতিবিদরা জানেন, নিউক্লিয়ার চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হলে শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বাসও ফিরে আসবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ এর দাবি আর আগের মতো কঠোর নয় বলে মনে হলেও, ইসরায়েলের মতো মিত্ররা এতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব—হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মাধ্যমে—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি জটিলতা।


