TT Ads

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের কাছে পদ্মার ঠান্ডা পানিতে ভোরবেলা বাসডুবির ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ২৪টি মরদেহ। স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ২১টি লাশ। নিখোঁজ রয়েছে আরও অনেকে।

জেলা প্রশাসন নিশ্চিত করেছে, এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। জীবনের মায়া ছেড়ে কেউ ফিরছেন না, কেউ বা এখনও নিখোঁজ—শোকের ছায়া নেমে এসেছে একাধিক জেলার অসংখ্য পরিবারে।

মঙ্গলবার রাতের অন্ধকারে যাত্রা শুরু হয়েছিল পটুয়াখালীগামী ‘অগ্রদূত পরিবহন’ বাসটি। গন্তব্য ছিল বহুদূর, কিন্তু ভাগ্যে জুটলো পদ্মার স্রোত। বুধবার ভোররাতে দৌলতদিয়া ঘাটের কাছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায় বাসটি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দল নামে উদ্ধারকাজে। প্রথম আলো ফোটার আগেই উদ্ধার হয় কয়েকটি মরদেহ, আর শুরু হয় ট্র্যাজেডির হিসাব।

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাফিজুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত যাদের মরদেহ শনাক্ত করা গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু, নারী ও পুরুষ। শোকের তালিকায় দেখা যাচ্ছে, একাধিক পরিবারের একসঙ্গে একাধিক সদস্য চিরবিদায় নিয়েছেন। রাজবাড়ী পৌরসভার লালমিয়া সড়কের বাসিন্দা রেহেনা আক্তার ও তাঁর ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান—দুজনেই নেই। কুষ্টিয়ার খোকসার দেলোয়ার হোসেনের শিশু সন্তান ইস্রাফিল আজ বাবা-মায়ের কোলে ফিরবে না।

বাসটিতে কতজন যাত্রী ছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়। যাত্রীদের অনেকেই ছিলেন পর্যটক, আবার অনেকে ফিরছিলেন কর্মস্থল থেকে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের চর বারকিপাড়ার মর্জিনা আক্তার ও তাঁর মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি। একই এলাকার সজ্জনকান্দার কেবিএম মুসাব্বিরের শিশু সন্তান তাজবিদের মতো ছোট্ট এক প্রাণও সবার আগে থেমে গেছে।

উদ্ধারকারী দল সূত্রে জানা গেছে, বাসটি পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে ঘাটের কিছুটা দূরে তলিয়ে যায়। স্থানীয় জেলেরা প্রথমে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। পরে প্রশাসনের টিম যোগ দিলেও দুর্গম স্রোত ও অন্ধকার কাজকে কঠিন করে তোলে। বুধবার সারা দিন ও রাত, এবং বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ২৪টি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

এই তালিকার দিকে তাকালেই করুণ ছবি ভেসে ওঠে। নিহতদের মধ্যে শিশু সংখ্যাই বেশি। শিশু সন্তান ফাইজ শাহানূর, তাজবিদ, ইস্রাফিল, আরমান, আব্দুর রহমান, সাবিত হাসান—কেউই আর বড় হবে না। একাধিক পরিবার হারিয়েছে সংসারের স্তম্ভ। দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ঢাকামুখী নাছিমা, গোপালগঞ্জের মুক্তা খানম, আশুলিয়ার আয়েশা আক্তার—কেউ কর্মস্থলে ফিরছিলেন, কেউ বা আত্মীয়ের বাড়ি যাচ্ছিলেন। ফেরা হলো না কারও।

শোকের ছায়া জেলাজুড়ে:

রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ, ঝিনাইদহ, দিনাজপুর—শোকের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পাঁচ জেলায়। দৌলতদিয়া ঘাটের এই বাসডুবি শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি যেন পদ্মার দামাল স্রোতে ভেসে যাওয়া অসংখ্য স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি। প্রশাসন জানিয়েছে, মরদেহ শনাক্তের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাকি লাশও দ্রুত হস্তান্তর করা হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাসটি ঘাটে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তবে সঠিক কারণ জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘাটের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। স্থানীয়রা বলছেন, পদ্মার এই অংশে স্রোতের তীব্রতা ও ঘাটের অবকাঠামোগত দুর্বলতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *