TT Ads

জ্বর এলে কিংবা শরীরের কোনো অংশে ব্যথা অনুভূত হলেই হাতের নাগালে রাখা প্যারাসিটামলের প্যাকেটটির দিকেই প্রথম হাত বাড়ায় আমরা। সহজলভ্যতা আর অল্প দামের এই ওষুধটি এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে অনেকেই একে ‘নিরীহ’ ভেবে বসেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিরাপদ এবং ওভার-দ্য-কাউন্টার (চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায়) ওষুধ হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের সতর্কবাণী বলছে ভিন্ন কথা। অজান্তেই এই সাদা ট্যাবলেটের প্রতি আমাদের নির্ভরতা তৈরি করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যার সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে আমাদের যকৃৎ (লিভার)।

রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালের লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. আসিফ মাহমুদ জানান, গত কয়েক বছরে অজানা কারণে লিভার সিরোসিস বা লিভার বিকল হওয়ার যে রোগী বাড়ছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই প্যারাসিটামলের দীর্ঘমেয়াদী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্যারাসিটামল একটি বিষ, যেমন অন্য সব ওষুধই। শরীরে প্রবেশের পর এর উপাদানগুলি লিভারে গিয়ে বিপাক (মেটাবলাইজ) হয়। প্রতিবার ওষুধ খাওয়ার সময় লিভারের ওপর একটু চাপ পড়ে। কিন্তু নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি গেলে এই চাপ লিভারের কোষ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

সাধারণ মানুষের মধ্যে প্যারাসিটামলকে ঘিরে যে কয়টি ভুল ধারণা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে প্রধানটি হলো—‘প্যারাসিটামলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, যত খুশি খাওয়া যায়’। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক প্যারাসিটামল সেবনের সর্বোচ্চ নিরাপদ মাত্রা সাধারণত ৩ থেকে ৪ গ্রাম (প্রতি ৫০০ মিলিগ্রামের ৬ থেকে ৮টি ট্যাবলেট)। এই মাত্রা অতিক্রম করলেই ঝুঁকি শুরু হয়।

অনেকের ধারণা, একবারে একটু বেশি মাত্রায় বা অল্প সময়ের মধ্যে ঘন ঘন ওষুধ খেলে জ্বর বা ব্যথা দ্রুত সারে। চিকিৎসকদের মতে, এটি একেবারেই ভুল ধারণা। ওষুধের একটি নির্দিষ্ট কার্যকারিতা মাত্রা আছে; এর বেশি গেলে তা জ্বর কমাতে সাহায্য না করে উল্টো লিভারকে ধীরে ধীরে বিকল করে তোলে।

আরেকটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে কিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে এবং এর কার্যকারিতার কোনো তারতম্যও হয় না। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য খাবার পরে খাওয়াই বেশি নিরাপদ। তাছাড়া ‘প্যারাসিটামলের সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া জরুরি’—এটিও একটি ভুল ধারণা। প্যারাসিটামল সাধারণত পাকস্থলিতে এসিডিটি বা ঘা সৃষ্টি করে না; এসব সমস্যা করে অন্যান্য ব্যথানাশক যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা ন্যাপ্রোক্সেন-জাতীয় ওষুধ।

অনেক সময় জ্বর বা ব্যথা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই একসঙ্গে একাধিক ওষুধ খেয়ে ফেলেন রোগীরা। কিন্তু কিছু কিছু ওষুধ আছে যা প্যারাসিটামলের সঙ্গে খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

চিকিৎসকরা জানান, যক্ষ্মা (টিবি) বা মৃগীরোগের ওষুধ (যেমন- ফেনাইটোইন, কার্বামাজেপিন) যারা দীর্ঘমেয়াদে খাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামলের বিষাক্ত প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। এসব ওষুধ লিভারের এনজাইমগুলোর কার্যকারিতা বদলে দেয়, ফলে প্যারাসিটামলের উপাদান লিভারে গিয়ে জমতে থাকে এবং সহজে ভাঙতে পারে না। ফলে অল্প মাত্রার প্যারাসিটামলও লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এছাড়া যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন, তাদের জন্যও প্যারাসিটামল অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ মদ্যপানের ফলে যে লিভার আগে থেকেই দুর্বল, সেখানে প্যারাসিটামলের বিষাক্ত প্রভাব কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *