মঞ্চে ফ্রি প্যালেস্টাইনের ধ্বনি, লালগালিচায় তারকাদের চোখ ধাঁধানো ফ্যাশন, আর ইতিহাস গড়া কিছু অর্জন—সব মিলিয়ে ৯৬তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস বা অস্কার ২০২৪ ছিল নানা নাটকীয়তা ও নতুন রেকর্ডে ভরপুর।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত এই আসরে হলিউডের চিরচেনত জৌলুসের পাশাপাশি উঠে এসেছে রাজনৈতিক সুরও। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সোচ্চার স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমের বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়েছে।
অস্কারের মঞ্চ কেবল সিনেমার পুরস্কার বিতরণীর জন্যই বিখ্যাত নয়, এটি সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তার একটি জোরালো মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। এবারের আসরটি যেন তার ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করল।
সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার ঘোষণা করতে মঞ্চে আসেন স্প্যানিশ তারকা হাভিয়ের বারদেম। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই অভিনেতা পুরস্কার ঘোষণার আগে যুদ্ধবিরোধী বার্তায় মঞ্চ মাতিয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘যুদ্ধ নয়, মুক্ত হোক ফিলিস্তিন।’
তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারি থেকে ভেসে আসে করতালির ঝড়। শুধু বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি বারদেম, তাঁর পোশাকে যুদ্ধবিরোধী একটি পিনও পরেছিলেন, যা ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি এবারের অস্কারের আরেক মুখ ছিল ফ্যাশন ও রেকর্ড। লালগালিচায় তারকাদের চোখধাঁধানো উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পিপলডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোল্ডেন গ্লোবজয়ী অভিনেত্রী কেড হাডসন, ‘পুওর থিংস’-এর তারকা এমা স্টোন, তিয়ানা টেইলর, কিংবদন্তি অভিনেত্রী ডেমি মুর, এল ফ্যানিং এবং ‘আনাতমি অফ আ ফল’-এর জন্য প্রশংসিত মাইকি মেডিসনরা লালগালিচায় সেরা পোশাকে আলো ছড়িয়েছেন।
তবে এর মধ্যেই নতুন ইতিহাস গড়েছেন এমা স্টোন। ‘পুওর থিংস’-এ অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন, যা তাকে বর্তমান সময়ের সেরা অভিনেত্রীদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করল।
এবারের অস্কারে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য দিক ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ওপেনহাইমার’ সবচেয়ে বেশি পুরস্কার জিতে সেরা ছবির মুকুট নিজের করে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই বায়োপিকটি জিতে নেয় মোট সাতটি অস্কার। এছাড়া ‘পুওর থিংস’ তিনটি এবং ‘আমেরিকান ফিকশন’ একটি পুরস্কার পেয়েছে। তবে পুরস্কারের পাশাপাশি সেলিব্রেটিদের মজার মূহুর্তও ছিল চোখে পড়ার মতো। জন সিনার নগ্ন উপস্থিতি এবং আরও কয়েকটি অঘটন অনুষ্ঠানে হাসির রোল তুললেও, হাভিয়ের বারদেমের গম্ভীর রাজনৈতিক বক্তব্যই যেন সন্ধ্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
বিনোদনের এই জগতে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া নতুন কিছু নয়। অতীতেও মার্লন ব্র্যান্ডো, ভ্যানেসা রেডগ্রেভের মতো তারকারা অস্কারের মঞ্চ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে হাভিয়ের বারদেমের এই ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হলিউডে সাধারণত ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব বেশি থাকলেও, বারদেমের মতো শক্তিশালী কণ্ঠের এই বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মূল ঘটনাবলি (সংক্ষিপ্ত তালিকা):
-
রাজনৈতিক বার্তা: হাভিয়ের বারদেম অস্কার মঞ্চে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বলে যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেন।
-
ফ্যাশন আইকন: লালগালিচায় কেড হাডসন, এমা স্টোন, ডেমি মুরের মতো তারকারা সেরা পোশাকে আলো ছড়ান।
-
নতুন রেকর্ড: এমা স্টোন দ্বিতীয়বারের মতো সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জিতে ইতিহাস গড়েন।
-
সেরা ছবি: ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ওপেনহাইমার’ সেরা ছবি-সহ মোট সাতটি পুরস্কার অর্জন করে।
-
উপস্থিতি: সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে যুক্তরাজ্যের ‘দ্য জোন অফ ইন্টারেস্ট’ পুরস্কার পায়, যা হলোকস্টের ওপর নির্মিত হলেও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করে।
সব মিলিয়ে ৯৬তম অস্কার প্রমাণ করল যে, রুপালি পর্দার জাদুর পাশাপাশি বাস্তব জগতের কঠোর বাস্তবতাও এই মঞ্চের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাভিয়ের বারদেমের সোচ্চার কণ্ঠ যেখানে গাজার শিশুদের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে, সেখানে এমা স্টোনের জয় প্রতিভার বিজয় ঘোষণা করেছে।


