আনন্দের কাফেলা ফিরছিল বিয়েবাড়ি থেকে। সঙ্গে ছিল স্বপ্ন, ছিল আগামীর পথচলার পরিকল্পনা। কিন্তু নিয়তি বোধহয় সেদিন অন্য খেলা খেলছিল। বাগেরহাটের রামপালে মাইক্রোবাস ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ১৩ জনসহ ১৪ জন নিহত হওয়ার মর্মান্তিক খবরে গোটা অঞ্চল শোকে স্তব্ধ। খুন হয়ে গেল বরযাত্রীর গান; বর আর কনের বদলে বাড়ি ফিরল লাশ।
বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার গুনাই ব্রিজ এলাকায় এই প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। তারই প্রিয় ছেলে সাব্বিরের বিয়ের পাণিগ্রহণ শেষে বাড়ি ফিরছিল গোটা পরিবার।
জানা যায়, আব্দুর রাজ্জাক বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলায় তার ছেলে সাব্বিরের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাতে দীর্ঘক্ষণ বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরের পর একটি মাইক্রোবাস ও একটি প্রাইভেটকার ভরে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। ১৫ আসনের মাইক্রোবাসটিতে ছিলেন বর সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই জনি, আব্দুল্লাহ, আল-আমিন, বোন ঐশি, তিন ভাইয়ের স্ত্রী, বোনের মেয়ে, মেয়ে জামাই এবং নাতি-নাতনিসহ মোট ১৫ জন।
পথে আনন্দ-ফুর্তিতে কেটেছে সময়। কিন্তু গুনাই ব্রিজ পেরোনোর সময় হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে মাইক্রোবাসটি। দ্রুতগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে এর প্রচণ্ড মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ধাক্কার তীব্রতায় মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ১১ জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও তিনজন।
দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকা দীর্ঘ ও বেদনার্ত। বর সাব্বির (২৫), তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৬০), মা সাহিদা বেগম (৫৫), ভাই জনি (২২), আব্দুল্লাহ (২০), আল-আমিন (১৮), বোন ঐশি (১৬), সাব্বিরের স্ত্রী (নববধূ) সাথী (২২), ভাইয়ের স্ত্রী রুমা (২৫) ও শিউলি (২২), বোনের মেয়ে নুসরাত (৯) এবং মেয়ে জামাই নুরে আলম সিদ্দিকী (৩৫)। এছাড়া মাইক্রোবাসের চালক সোহাগও নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাস থেকে ছিটকে পড়ে থাকা লাল টুকটুকে বরের পোশাক আর কনের চুড়ি দেখে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায় সবার। বিয়ের আনন্দের কোনো চিহ্ন সেখানে ছিল না; শুধু ছিল কান্না আর হাহাকার।
রামপাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজ চালায়। মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো এলাকা স্তব্ধ। মোংলা-খুলনা মহাসড়কের এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে পরিচিত। স্থানীয়রা বলছেন, সড়কের প্রশস্ততা ও চলাচলকারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।
মোংলা পোর্ট পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, “একটি পরিবারের ১৩ জন সদস্য একসঙ্গে চলে যাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এই শোক যেন সত্যিই অসহ্য।” নিহত ১৪


