সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা প্রশ্ন তুলেছেন—সন্তানের খুনের ভিডিও ফুটেজ স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন পুলিশ সদস্যের মাত্র তিন বছরের সাজা যৌক্তিক হতে পারে? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনের হত্যাকাণ্ডের মামলায় এই রায়ের পর শোকাহত পরিবারের এই ক্ষোভ জাতীয় বিচারপ্রক্রিয়ার গভীরতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে আনাসের মা বলেন, “আমার ছেলের শেষ মুহূর্তের ভিডিও সবাই দেখেছে। গুলি চালানোর মুহূর্ত, রক্তাক্ত রাস্তা—সবকিছু সামনে। তবু যারা গুলি চালিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মাত্র তিন-চার বছরের সাজা। এটা কীভাবে আমার সন্তানের জীবনের দাম হয়?” তাঁর কণ্ঠে কান্না মিশে গেলেও প্রশ্ন ছিল স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ—যেন গোটা জাতির অব্যক্ত ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।
এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা অনেকের কাছে ন্যায়ের এক ধাপ এগোনো। কিন্তু নিচুতলার কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের সাজা নিয়ে পরিবারগুলোর মনে অসন্তোষ। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সরাসরি গুলি চালিয়েছে, এবং সিসিটিভি ও মোবাইল ফুটেজে তা প্রমাণিত। তবু তিন কনস্টেবল—সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল—প্রত্যেককে মাত্র তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক আরশাদ হোসেন চার বছর পেয়েছেন। এই সাজাগুলোকে অনেকে ‘হালকা’ বলে মনে করছেন, বিশেষ করে যখন মামলাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অধীনে বিচার হয়েছে।
পটভূমিতে ফিরে যাই। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের চরম মুহূর্তে, ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক প্রাণ হারান। এই ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মামলা গঠন হয়, তদন্ত শেষ হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়। ট্রাইব্যুনালে ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়, যার মধ্যে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। আনাসের মা নিজেও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছিলেন।
রায়ের পর আনাসের বাবা সাহরিয়ার খানও বলেন, “উচ্চপদস্থদের সাজা দেখে কিছুটা স্বস্তি হয়েছে, কিন্তু যারা সরাসরি ট্রিগার টেনেছে, তাদের এত হালকা সাজা মেনে নেওয়া কঠিন।” পরিবারগুলোর এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিচারের পথে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়ের অনুভূতি পুরোপুরি ফিরে আসেনি।


