মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালির ওপর দিয়ে যখন ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের আগুনের হলকা ছুটে চলেছে, তখন তার শিখা এসে লাগছে বাংলাদেশের আকাশপথেও। নিরাপত্তা ঝুঁকিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুক্রবার (১৩ মার্চ) আরও ২৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
এ নিয়ে গত ১৪ দিনে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়ালো ৪৭৫টিতে, যা বিমান চলাচলের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী ও বিদেশগামী যাত্রী। পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের অনেকেই এখন বিমানবন্দর টার্মিনালেই অনিশ্চয়তার কষ্ট গুনছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ২৮টি ফ্লাইট বাতিলের পর আজ শুক্রবার নতুন করে আরও ২৫টি ফ্লাইট স্থগিত করায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইরানের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে যেসব ফ্লাইট পরিচালিত হতো, সেগুলোর বেশিরভাগই এখন আটকে গেছে। ইসরায়েলের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিতে এই অঞ্চলের আকাশপথ এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিমান চলাচল এলাকায় পরিণত হয়েছে।
বিমানবন্দরে এসে দেখা গেল এক করুণ দৃশ্য। কেউ কেউ ফিরতি টিকিটের জন্য কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউ বা এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিদের সাথে তর্কে জড়িয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিলের খবর আগে থেকে না জানিয়ে শেষ মুহূর্তে তাঁদের বিমানবন্দরে এনে বিপাকে ফেলা হচ্ছে।
দুবাই, দোহা, জেদ্দা, মাস্কাট হয়ে ইউরোপ ও আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল অনেকের। কিন্তু বিকল্প রুটে ফ্লাইট পরিচালনা খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিমান সংস্থাগুলোও কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারছে না।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বিমান চলাচল এই সংকটের মুখে পড়েছে। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বেবিচকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে যেসব আন্তর্জাতিক রুট রয়েছে, সেগুলো বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে সময় লাগছে দ্বিগুণ, খরচ বাড়ছে জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে। ফলে এয়ারলাইনসগুলো স্বল্প নোটিশে ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।”
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স যাত্রীদের ওপরও। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ছুটির পর কর্মস্থলে ফেরা আটকে যাওয়ায় তাদের চাকরি নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। গত ১৪ দিনে প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী এই ফ্লাইট বাতিলের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে শুরু করে সাধারণ ওয়েটিং রুম—সব জায়গায় এখন এক ছবি। উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভের।
আবুধাবি ফেরত এক যাত্রী কামরুল হাসান বলেন, “গত তিন দিন ধরে বিমান ধরতে এসে ফিরে যাচ্ছি। ছুটি শেষ হয়ে গেছে, চাকরি নিয়ে টেনশন হচ্ছে। এয়ারলাইনস বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে জানানো হবে। কিন্তু কবে হবে, কেউ জানে না।”


