ইরানকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত রাখতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এখন এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংঘাত। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২,৫৩০ জন।
রণক্ষেত্র এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য
গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এই সামরিক উত্তেজনা এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দাবি, ইরানের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই অজুহাতে তারা ইরানের কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে যৌথ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
তবে তেহরানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। পাল্টা জবাব হিসেবে তারা ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলি স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতেও ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালাচ্ছে ইরান। এর ফলে এক সময়ের ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা গ্রাস করেছে পুরো অঞ্চলকে।
মানবিক বিপর্যয় ও লাশের মিছিল
যুদ্ধের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হচ্ছে নিহতের সংখ্যায়। আল-জাজিরা বৃহস্পতিবার তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের ওপর শুরু হওয়া এই হামলা এবং এর পরবর্তী পাল্টা আঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ২,৫৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিহতের তালিকায় সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংঘাতের পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগরীয় বেশ কিছু দেশ এখন সরাসরি এই যুদ্ধের কবলে। মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের প্রক্সি গ্রুপগুলোর হামলা এবং পাল্টা হিসেবে মার্কিন বিমান বাহিনীর অভিযানে সাধারণ মানুষের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র: এক নজরে মূল তথ্য
-
আক্রান্ত দেশ: মধ্যপ্রাচ্যের মোট ১৪টি দেশে যুদ্ধের প্রভাব ও সরাসরি হামলা ছড়িয়ে পড়েছে।
-
মোট প্রাণহানি: এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া নিহতের সংখ্যা ২,৫৩০ জন।
-
হামলার লক্ষ্যবস্তু: ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা এবং আরবে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।
-
শুরুর তারিখ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এই যৌথ অভিযান শুরু হয়।
কৌশলগত বিশ্লেষণ: সংঘাত কি থামবে?
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল দুটি পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে, অন্যদিকে ইরান চাইছে মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।
ইসরায়েলের জন্য এই লড়াই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত হলেও, আরব বিশ্বের দেশগুলো এই দ্বন্দ্বে পিষ্ট হচ্ছে। তেল সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে।


