ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল জ্বালানি করিডর—হরমুজ প্রণালি। ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে এই প্রণালি বন্ধ করে দেয় বা তেল সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায়, তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ঘুরপাক খাচ্ছে ৭০-৭৩ ডলারের আশপাশে, কিন্তু এই সংকট গড়ালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝড় উঠবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও প্রচুর এলএনজি পরিবহন হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ। ইরানের উপকূলঘেঁষা এই প্রণালি তাদের জন্য কৌশলগত অস্ত্রের মতো। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ইকুইরাসের প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু ইরানের নিজস্ব তেল উৎপাদন ব্যাহত হলেও দাম ৯-১৫ শতাংশ বাড়তে পারে। আর প্রণালি বন্ধ হলে ভূ-রাজনৈতিক প্রিমিয়াম যোগ হয়ে দাম আরও অনেকটা ঊর্ধ্বমুখী হবে।
ইরান বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে, যা বিশ্ব সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অংশ রপ্তানি হয়, বিশেষ করে চীনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহে প্রতি ১ শতাংশ কমতি হলে তেলের দাম সাধারণত ৩-৫ শতাংশ বাড়ে।
সে হিসেবে ইরানের তেলই ব্যাহত হলে দাম ৯-১৫ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি দেখতে পারে। কিন্তু বাজার যুদ্ধকে লিনিয়ারভাবে মূল্যায়ন করে না। প্রণালির ঝুঁকি দেখা দিলে ২০-৪০ ডলারের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যোগ হতে পারে, যা দামকে ৯৫-১১০ ডলারের দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম।
এই উত্তেজনা শুধু তেলের দাম নয়, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প—সবকিছুতেই খরচ বেড়ে যাবে। প্রবাসী রেমিট্যান্সও চাপে পড়তে পারে যদি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। ওপেক+ দেশগুলোর অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা কিছুটা সামলাতে পারলেও, প্রণালির মতো চোকপয়েন্ট বন্ধ হলে বিকল্প পথ খুব সীমিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান নিজেও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। বন্ধ করলে তাদের রপ্তানিও ব্যাহত হবে, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। তবু, প্রতিশোধের রাজনীতিতে এমন ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব নয়। বর্তমানে বাজারে ইতিমধ্যে ৭-১০ ডলারের ভূ-রাজনৈতিক প্রিমিয়াম যোগ হয়েছে। সংঘাত আরও বাড়লে এটি আরও বেড়ে যাবে।


