বিদেশের মাটিতে অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশির জীবনের গল্প শেষ হয়ে গেল নিঃশ্বাসের আগুনে। ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত মালদ্বীপের অদূরে দিগুড়া আইল্যান্ডে এক নির্মাণশ্রমিকের গেস্ট হাউজে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় আরও দুই বাংলাদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার ভোরে রাজধানী মালে থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে দিগুড়া দ্বীপের একটি নির্মাণ কোম্পানির কর্মীদের থাকার গেস্ট হাউজে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বেশিরভাগ কর্মী। ধোঁয়া ও আগুনের তীব্রতায় দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।
নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। তারা হলেন— তাজ উদ্দিন ইসলাম, মো. সদর আলী, মো. রবিন মোল্লা, সফিকুল ইসলাম ও মো. নূরনবী সরকার। এ ঘটনায় গুরুতর আহত জামাল উদ্দিন ও সাদ্দাম হোসেন নামের আরও দুই বাংলাদেশিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী মালেতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়েই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
দগ্ধ অবস্থায় যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তারা সবাই একই নির্মাণ কোম্পানির শ্রমিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, খবর পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাটির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে। আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দূতাবাস। নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
দিগুড়া দ্বীপটি রাজধানী মালে থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। সম্প্রতি পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এ দ্বীপে কাজ করতে যাচ্ছেন। কম খরচে সহজে কাজের সুযোগ মেলায় বাংলাদেশিদের কাছে মালদ্বীপ অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সেখানে কর্মীদের থাকার মান, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার মান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে।
এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও মালদ্বীপের বিভিন্ন দ্বীপে বাংলাদেশি কর্মীদের আবাসস্থলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটিকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কাটছে না।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালদ্বীপে যান, কিন্তু তাঁদের আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে তেমন কোনো কঠোর নির্দেশনা বা তদারকি নেই।
নিহত তাজ উদ্দিন ইসলামের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বাসিন্দা। মাত্র এক বছর আগে স্বপ্ন নিয়ে মালদ্বীপে গিয়েছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী ও এক সন্তান অসহায় হয়ে পড়েছেন। একই চিত্র অন্যদের ক্ষেত্রেও। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্নভাঙার গল্প।
মালদ্বীপে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানান, অনেক নির্মাণ কোম্পানি তাদের কর্মীদের অস্থায়ী ও নিম্নমানের টিনশেড বা কাঠের ঘরে রাখে। সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকে না। ফলে সামান্য দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।


