ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট থেকে দায়েরকৃত মামলাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নিরীহ মানুষ যাতে অহেতুক ভোগান্তির শিকার না হন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই লক্ষ্যে এই উদ্যোগ।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত সকল অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যা বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয়ে বেলা আড়াইটায় শেষ হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী, র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমানসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বর্ণনা দেন, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। এরপর ৫ আগস্ট থেকে বিভিন্ন মামলা দায়ের হয়, যার মধ্যে অনেকগুলো সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা প্রতিহিংসামূলক বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নামে এসব মামলা দায়ের করে অনেককে অহেতুক হয়রানি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “৫ আগস্টের পর বেশ কিছু মামলা হয়েছে, কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এসব মামলা করেছে। ব্যবসায়ী-সাংবাদিকসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষদের নামে মামলা করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, এসব মামলা যাচাই-বাছাই করে পুলিশ সরকারকে প্রতিবেদন দেবে, যাতে নিরীহরা ভোগান্তি থেকে মুক্তি পায়।
এই সিদ্ধান্তের পটভূমিতে দেখা যায়, সরকার পতনের পর অনেক প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড ঘটেছে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই যাচাই প্রক্রিয়া আইনের শাসনকে শক্তিশালী করবে এবং অপব্যবহার রোধ করবে। তবে এতে সময় লাগতে পারে, কারণ পুলিশকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
বৈঠকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আওয়ামী লীগের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) প্রদত্ত অস্ত্র লাইসেন্সগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কি না, লাইসেন্সধারীরা যোগ্য কি না—সব দেখা হবে। অযোগ্যদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।” এ ছাড়া, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা পুনরায় তদন্তের জন্য নতুন কমিশন গঠন করা হবে।
পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কারও আলোচনায় উঠে এসেছে। লটারি পদ্ধতিতে ওসি ও এসপি নিয়োগ বন্ধ করে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন করা হবে। এ ছাড়া, জাল ঠিকানায় পুলিশ নিয়োগের অভিযোগ যাচাই করা হবে এবং ২ হাজার ৭০১ কনস্টেবল পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হবে। ২০০৬ সালে চাকরি হারানো সাড়ে ৬০০ এসআই ও সার্জেন্ট চাকরি ফিরে পাবেন। পাসপোর্টের ভোগান্তি কমাতে নিবন্ধিত সহায়ক চালু করা হবে, যা দলিল লেখকের মতো কাজ করবে।
পুলিশের কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “পুলিশের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” মব কালচার বা মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের প্রচলন বন্ধ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।