বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় এই ফোনালাপ হয়, যাতে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে।
তারেক রহমান, যিনি বিএনপির চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র, সম্প্রতি ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ১৭ বছরের নির্বাসন জীবন শেষ করে গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরে তিনি দলের নেতৃত্ব নেন, এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তার মায়ের মৃত্যুর পর এই বিজয় তাকে রাজনৈতিক বংশপরম্পরার এক শক্তিশালী উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি ২০২২ সাল থেকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, নিজেও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন।
ফোনালাপে তিনি তারেক রহমানের নির্বাচনী বিজয়কে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, আলোচনায় উঠে এসেছে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির অন্যতম। গত পাঁচ দশকে এই সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদের উন্নয়নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ৯ লক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছেন, যারা বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
তবে, এই সম্পর্কে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের শোষণ, ন্যায্য মজুরি এবং কাজের পরিবেশের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। গত বছর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য লেবার মার্কেট পুনরায় খোলার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখনও অমীমাংসিত। তারেক সরকারের অধীনে এই বিষয়গুলি সমাধানের জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।
বাণিজ্যিক দিক থেকে, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য, পাম অয়েল এবং রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি হয়, যখন বাংলাদেশ থেকে টেক্সটাইল, পোশাক এবং ফুটওয়্যার রপ্তানি হয়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ, যা টেলিকম, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং টেক্সটাইল সেক্টরে বিনিয়োগ করেছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনুসের মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, শক্তি, বাণিজ্য এবং শিক্ষায় পাঁচটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া, একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য কাজ চলছে, যা দুই দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই উদ্যোগগুলি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ফোনালাপের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। মালয়েশিয়া আসিয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এবং এই সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা পেতে পারে। আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতিশ্রুতি অনুসারে, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে উন্নয়নের নতুন পথ খুলবে।