অমর একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা বাজার ঠিক চার মিনিট আগে তিনি কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে পৌঁছান।

রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। রাত ১২টা ১ মিনিটে তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের সেই কালজয়ী সুর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’ বেজে ওঠে। রাষ্ট্রপতি ধীরগতিতে বেদির দিকে এগিয়ে যান এবং পুষ্পস্তবক অর্পণের পর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

রাষ্ট্রপতির প্রস্থানের পর রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই ছিল তাঁর প্রথম একুশের শ্রদ্ধা নিবেদন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুনরায় শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান। এরপর তিন বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ক্রমান্বয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৯৫২ সালের এই দিনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সেই ত্যাগের বিনিময়ে আজ বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৫২ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ যাত্রায় একুশ কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি লাভের পর এটি এখন বিশ্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে এই গৌরবোজ্জ্বল দিনটি।

বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষার দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ১ মিনিট ছোঁয়ার আগেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পুরো এলাকায় বিরাজ করছিল এক ভাবগম্ভীর পরিবেশ। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের করুণ সুরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

রাষ্ট্রপতির পর রাত ১২টা ৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ও নিজ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুনরায় শ্রদ্ধা জানান।

রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় জনসাধারণের জন্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে, হাতে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ এবং একগুচ্ছ ফুল নিয়ে সারিবদ্ধভাবে শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। রাজধানী ছাড়িয়ে গ্রাম-বাংলার প্রতিটি জনপদে আজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অমোঘ সেই স্লোগান— ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।

১৯৫২ সালের এই দিনে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে ভিজেছিল ঢাকার রাজপথ। সেই আত্মত্যাগের ফল আজকের এই বাংলা ভাষা। ১৯৫২ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ ৭৪ বছরের যাত্রায় একুশ এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর এটি এখন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। সারা বিশ্বের মানুষ আজ নিজ নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় এই দিনটিকে উদযাপন করছে।

বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টেলিফোন করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

আজ শুক্রবার বেলা তিনটায় এই ফোনালাপ হয়, যাতে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে।

তারেক রহমান, যিনি বিএনপির চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র, সম্প্রতি ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ১৭ বছরের নির্বাসন জীবন শেষ করে গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরে তিনি দলের নেতৃত্ব নেন, এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। তার মায়ের মৃত্যুর পর এই বিজয় তাকে রাজনৈতিক বংশপরম্পরার এক শক্তিশালী উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি ২০২২ সাল থেকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, নিজেও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন।

ফোনালাপে তিনি তারেক রহমানের নির্বাচনী বিজয়কে অভিনন্দন জানান এবং দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, আলোচনায় উঠে এসেছে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। ১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির অন্যতম। গত পাঁচ দশকে এই সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদের উন্নয়নে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, মালয়েশিয়ায় প্রায় ৯ লক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছেন, যারা বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

তবে, এই সম্পর্কে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের শোষণ, ন্যায্য মজুরি এবং কাজের পরিবেশের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। গত বছর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য লেবার মার্কেট পুনরায় খোলার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখনও অমীমাংসিত। তারেক সরকারের অধীনে এই বিষয়গুলি সমাধানের জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।

বাণিজ্যিক দিক থেকে, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য, পাম অয়েল এবং রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি হয়, যখন বাংলাদেশ থেকে টেক্সটাইল, পোশাক এবং ফুটওয়্যার রপ্তানি হয়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নবম বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ, যা টেলিকম, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং টেক্সটাইল সেক্টরে বিনিয়োগ করেছে।

২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনুসের মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, শক্তি, বাণিজ্য এবং শিক্ষায় পাঁচটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া, একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য কাজ চলছে, যা দুই দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই উদ্যোগগুলি ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই ফোনালাপের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। মালয়েশিয়া আসিয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, এবং এই সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা পেতে পারে। আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতিশ্রুতি অনুসারে, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে উন্নয়নের নতুন পথ খুলবে।

রাজধানী ঢাকায় আগামীকাল মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিতব্য কর্মসূচির চারপাশে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।

আজ শুক্রবার সকাল ১১টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ আশ্বাস দেন, যা দিবসটির নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এই দিবসটি ভাষা শহীদদের স্মরণে জাতীয় গর্বের প্রতীক।

এই প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশনার সাজ্জাত আলী বিস্তারিতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। শহীদ মিনার এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর এবং ডগ স্কোয়াড। এছাড়া, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। কমিশনারের কথায়, “আমরা জাতীয় এই দিবসকে শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনগণের নিরাপত্তা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।”

মহান শহীদ দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফিরে যাই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাস্তায় নামেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আব্দুস সালাম, আব্দুল জব্বার, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমানসহ অনেকে। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীজ বপন করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা বিশ্বব্যাপী ভাষা বৈচিত্র্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। বাংলাদেশে এটি জাতীয় ছুটির দিন, যেখানে লাখো মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এবারের কর্মসূচি শুরু হবে আজ রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে। তারপর সারাদিন চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং প্রভাতফেরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মহামারির কারণে অনুষ্ঠানগুলোতে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এবার ডিএমপির আশ্বাসে জনমনে স্বস্তি ফিরেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দিবসটি শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং ভাষা অধিকারের লড়াইয়ের প্রতীক। পুলিশের পরিকল্পনায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিত্সা সুবিধা এবং সাইবার নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত বছরের মতো এবারও মাস্ক এবং সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা থাকতে পারে, যদিও কোভিডের প্রভাব কমেছে। জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে কমিশনার বলেন, “সবাই মিলে এই দিবসকে সফল করি।”

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এর রাত সাড়ে দশটায় পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে শুরু হয়ে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে। রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক ও পারফিউমের গুদাম থাকায় আগুন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। যানজটে আটকে পড়া মানুষজন বুঝে ওঠার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সাত বছর পরও বিচার না পাওয়ার বেদনায় কাঁদছেন স্বজনহারা পরিবারগুলো।

সেই রাতের কথা আজও অনেকের চোখে জ্বলে ওঠে। চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলা থেকে শুরু হয় আগুন। গায়ে গায়ে লাগানো সরু গলির ভবনগুলোতে রাসায়নিক পদার্থের মজুত থাকায় আগুন যেন দানবের মতো লেলিহান হয়ে ওঠে। বিস্ফোরণের শব্দে চারদিক কেঁপে ওঠে। রাস্তায় যানজটের মধ্যে আটকে থাকা রিকশা, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল আর পথচারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেকে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যান, কেউবা আগুনের শিখায় ঢেকে যান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন পৌঁছান, তখন পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢাকা। উদ্ধারকাজ চলে দীর্ঘ সময়। শেষ পর্যন্ত ৭১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়, আহত হন শতাধিক।

এই অগ্নিকাণ্ডের পর দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। সরকার রাসায়নিক গুদাম সরানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, ফায়ার সেফটি নিয়ম কঠোর করার কথা বলে। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও চুড়িহাট্টা এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম এখনও রয়ে গেছে। সাইকেল ভ্যানে করে বিপজ্জনক দ্রব্য পরিবহন চলছে অবাধে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি—ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দোষীদের শাস্তি—এখনও অপূর্ণ।

মামলার অগ্রগতি আরও হতাশাজনক। ঘটনার পরদিন চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন এক নিহতের ছেলে মো. আসিফ। অভিযুক্তদের মধ্যে ভবন মালিক, দোকানদার ও কর্তৃপক্ষের লোকজন রয়েছেন। ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি চলছে। ১৬৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, বিচার শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই। এই দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগীদের মনে নতুন করে ক্ষত তৈরি করছে।

প্রতি বছর এই দিনে দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত আর স্মরণসভা হয়। পরিবারের সদস্যরা ফুল দিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে শুধু বেদনাই নয়, অসহায়ত্বও ফুটে ওঠে। অনেকে বলেন, “আমরা প্রাণ হারিয়েছি, কিন্তু বিচার না পেলে শান্তি কোথায়?” সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনেক পরিবার এখনও এক টাকাও পাননি।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলায় ছিনতাইকারী সন্দেহে স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে দুজন নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোরে খোদ্দকোমরপুর ইউনিয়নের মোজাহিদপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত না হলেও পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করেছে।

ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন আঁধার ভেদ করে যখন গ্রামের মানুষজন ঘুম থেকে উঠছিলেন, তখনই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকজন যুবক মোটরসাইকেলযোগে এলাকায় ঘুরছিলেন। হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে ওঠেন—‘ছিনতাইকারী!’ এই একটি শব্দই যেন আগুনের ফুলকি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ক্ষুব্ধ জনতা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ঘিরে ফেলে। তিনজনের মধ্যে একজন অন্ধকারের আড়ালে পালাতে সক্ষম হন, কিন্তু বাকি দুজন আর রক্ষা পাননি। লাঠি-সোঁটা, ইট-পাটকেল আর হাতের যা কিছু ছিল তাই দিয়ে চলে নির্মম প্রহার। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খবর পেয়ে সাদুল্লাপুর থানার কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেন এবং ঘটনাস্থল থেকে একটি মোটরসাইকেল জব্দ করেন। বেলা ১১টার দিকে গাইবান্ধা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাদুল্লাপুরের এই অঞ্চলে গত কয়েক মাস ধরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে ভোরবেলা বা রাতের অন্ধকারে মোটরসাইকেলে করে এসে লোকজনের মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেকে বলছেন, পুলিশি টহল কম থাকায় এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় তারা নিজেরাই ‘বিচার’ করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু এই ‘বিচার’ যে কতটা বিপজ্জনক এবং অমানবিক, তা আজকের ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো।

গণপিটুনির এই প্রবণতা বাংলাদেশে নতুন নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় চোর-ছিনতাইকারী সন্দেহে শতাধিক মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরে দেখা গেছে, নিহতরা নিরীহ ছিলেন বা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জনগণের মধ্যে আস্থার সংকটের চিত্র তুলে ধরে।

সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলিম উদ্দিন জানান, ঘটনার পর থেকে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া তৃতীয় ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্তে যদি ছিনতাইয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সে দিকেও খোঁজ নেওয়া হবে। কিন্তু গণপিটুনি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে তিনি স্পষ্ট করেন।

পবিত্র রমজান মাস শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। কিন্তু রোজার ঠিক আগেই লেবু, বেগুন, শসা, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা মরিচ, খেজুর, ব্রয়লার মুরগি ও বিভিন্ন মাছের দাম চড়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর রমজানের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার একটি দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফেব্রুয়ারি ১৭ বা ১৮ তারিখে রমজান শুরু হওয়ার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়েছেন, যা সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

ঢাকার কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল এবং অন্যান্য বড় বাজারে গিয়ে দেখা যায়, লেবুর দাম চারটি পিসে ৮০ থেকে ১২০ টাকা হয়েছে, যা গত সপ্তাহে ৬০-১০০ টাকা ছিল। বেগুনের দাম কেজিতে ৮০-১৪০ টাকা, যা ৩০-৪০ টাকা বেড়েছে। শসা ৯০-১০০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা, টমেটো ৫০-৮০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ১৪০-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এসব সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ১০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

ইফতারের অপরিহার্য পণ্য খেজুরের দামও আকাশছোঁয়া। সাধারণ মানের খেজুর কেজিতে ২৪০-২৫০ টাকা, যা ৫০-১০০ টাকা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি কম এবং চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম বাড়ছে। কিন্তু ভোক্তারা অভিযোগ করছেন, এটি একটি সিন্ডিকেটের ফল।

প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। দু’সপ্তাহ আগে ১৬০-১৭০ টাকা কেজি ছিল, এখন ২০০-২২০ টাকা। সোনালী মুরগি ২৮০-৩৫০ টাকা কেজি। মাছের বাজারেও একই চিত্র। স্থানীয় মাছ যেমন রুই, কাতলা, ইলিশের দাম ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা রমজানের সেহরি ও ইফতারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, রমজানে চাহিদা বাড়ে, বিশেষ করে ইফতার আইটেমের। দ্বিতীয়ত, পরিবহন খরচ বেড়েছে এবং সরবরাহ চেইনে সমস্যা। তৃতীয়ত, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গঠন করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। অতীতে দেখা গেছে, রমজানের পর দাম কমে যায়, যা এই সিন্ডিকেটের প্রমাণ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খাদ্য মজুত যথেষ্ট এবং দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানও দাম নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। মার্কেট মনিটরিং জোরদার করা, আমদানি সহজ করা এবং সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। অন্যথায়, রমজানের আধ্যাত্মিকতা ছাপিয়ে দামের চাপই প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।

নতুন সরকারের দ্বিতীয় দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা। বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিনেই সচিবালয়ে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। দ্বিতীয় দিনে তিনি আবারও সচিবালয়ে যান এবং নিজ দপ্তরে পৌঁছানোর পরপরই তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে মিলিত হন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান এই সাক্ষাতে অংশ নেন। এটি ছিল একটি আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ, যা নতুন সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্কের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের শুরু। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি পেশাদার, রাজনীতিমুক্ত ও শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বিভিন্ন বক্তব্যে সেনাবাহিনীকে জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের আস্থা ও সমন্বয়ের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

সাক্ষাতের পর বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ছবি ও তথ্য শেয়ার করা হয়, যাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন প্রধানের হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখা যায়। এটি জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছেছে যে নতুন সরকার দ্রুততার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে। সচিবালয় সূত্র জানায়, সাক্ষাতে সাধারণত শুভেচ্ছা বিনিময়, জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো বিস্তারিত বিবৃতি এখনও প্রকাশিত হয়নি।

এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন ছিল, তার উত্তর দেওয়ার মতো। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছিল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই সাক্ষাৎ সেই আলোচনাকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ ঘোষণা দেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই পদক্ষেপ রমজানের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নতুন সরকারের প্রথম বড় উদ্যোগ।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ছিল অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক ভর্তুকি, নগদ সহায়তা এবং নিত্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বেড়েছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মন্ত্রী আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রধানমন্ত্রী চান ঈদের আগেই অন্তত পাইলট প্রকল্প শুরু হোক। রমজান মাসেই এটি চালু হবে, যাতে রোজাদাররা স্বস্তিতে বাজার করতে পারেন।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ মূলত ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এতে স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের নামে ভর্তুকিমূল্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে। কিছু ক্ষেত্রে নগদ অর্থও দেওয়া হতে পারে। মন্ত্রী জানান, এটি শুরুতে সার্বজনীন হবে—কোনো কঠোর শর্ত বা সীমাবদ্ধতা থাকবে না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে হতদরিদ্র, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও পশ্চাৎপদ পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরে ধাপে ধাপে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

এই প্রকল্পের পেছনে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিগত বছরগুলোতে টিসিবির ট্রাক সেল বা ওপেন মার্কেট সেলে সীমিত সুবিধা পাওয়া গেছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এই ব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত ও টেকসই করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার্ড যুক্ত করে দুর্নীতি কমানো যাবে এবং সঠিক মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হবে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, প্রায় পাঁচ কোটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য। শুরুতে পাইলট প্রকল্পে কয়েক লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর জাতীয় পর্যায়ে বিস্তার। বৈঠকে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে বাস্তবায়নের জন্য।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে, কোনো বাধা ছাড়াই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এই আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে, যা বিচারের গতিকে আরও মজবুত করবে। এই মন্তব্য এসেছে জুলাই হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সরকারি দলের ক্যাডারদের হাতে যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে প্রায় ১৪০০ জন নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়েছেন। এই ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ট্রাইব্যুনালকে পুনর্গঠন করে এসব অপরাধের বিচারের গতি বাড়িয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক চাপ বা পরিবর্তনের মুখে থমকে যাবে না। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল যেভাবে চলছে—সাক্ষ্য গ্রহণ, অভিযোগ গঠন, সূচনা বক্তব্য—সেভাবেই এগিয়ে যাবে। বর্তমান সরকারের সমর্থন এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর আগে বিভিন্ন মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়, জুনাইদ আহমেদ পলকসহ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাকাণ্ডের চিত্র আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে।

সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদদের পরিবারের সদস্যরা। মিরপুরের শহীদ ফজলে রাব্বি ও তানহার বাবা ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া জয়-পলকের মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন হয়েছে, যেখানে গণহত্যাকে পূর্বপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত বলে উল্লেখ করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১-এ এসব মামলার শুনানি চলছে, এবং আগামী দিনগুলোতে আরও সাক্ষ্য উপস্থাপনের তারিখ ধার্য হয়েছে।

এই বিচার প্রক্রিয়া শুধু অতীতের অপরাধের জবাবদিহিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শিক্ষা। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলা জরুরি।