চট্টগ্রাম বন্দরে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) নিয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি বড় ট্যাংকার আসছে। এর মধ্যে প্রথমটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা তিনটি জাহাজে মোট প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এশিয়ার জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই একের পর এক এলএনজিভাহী জাহাজ আসায় স্বস্তি ফিরছে সরকারি ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত সময়েই সবগুলো ট্যাংকার সচল রাখতে সক্ষম তারা।

অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম ট্যাংকার কুতুবদিয়ায়

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এলএনজি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘এইচএল পাফিন’ ট্যাংকারটি গত বৃহস্পতিবার কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে। জাহাজটি ইতিমধ্যেই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ‘এক্সেলারেট’-এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এই টার্মিনালটি থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, কুতুবদিয়ার ভাসমান টার্মিনালটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। ‘এইচএল পাফিন’ থেকে সেটি উত্তোলনের পর দেশের শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গার্হস্থ্য চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুটি ট্যাংকার পথে, ইন্দোনেশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে

চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরও দুটি এলএনজিভাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার বোন্টাং এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘নিউ ব্রেভ’ ট্যাংকারটি সমুদ্রপথে বাংলাদেশের দিকে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার রওনা হয়েছে।

দুটি জাহাজই আগামী বুধবারের (৩ এপ্রিল) মধ্যে কুতুবদিয়ার ভাসমান টার্মিনালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেগুলো থেকেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।

কেন এই জরুরি এলএনজি আমদানি?

দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ আসে দেশীয় উৎস থেকে। কিন্তু মাঠের চাপ কমে যাওয়ায় এবং শিল্প-বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা বাড়ায় সম্প্রতি সরবরাহ ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছিল। গ্রীষ্মের শুরুতে বিদ্যুতের চাহিদা চরমে ওঠার আগেই জ্বালানি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই তিনটি ট্যাংকার থেকে সংগৃহীত এলএনজি দেশের গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে। এতে আসন্ন গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বন্দরের প্রস্তুতি ও ভাসমান টার্মিনালের সক্ষমতা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরপর তিনটি এলএনজি ট্যাংকার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। কুতুবদিয়ায় অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল—‘এক্সেলারেট’ ও ‘এমএমটি’—সচল রয়েছে। একটি টার্মিনাল থেকে গ্যাস খালাসের পর পরবর্তী ট্যাংকারটি সংযুক্ত করতে স্বাভাবিক সময় লাগে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, জাহাজের আগমনের মধ্যবর্তী সময় ও টার্মিনালের অপারেশনাল সক্ষমতা বিবেচনায় রেখেই এই তিনটি জাহাজের আগমন পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ চিত্র

বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম স্থিতিশীল থাকায় সরকার এই মুহূর্তে আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছে। গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে এলএনজির দাম চড়া থাকায় বাংলাদেশকে আমদানি কমাতে হয়েছিল। এখন দাম কিছুটা নিম্নমুখী থাকায় বাড়তি জ্বালানি মজুত করা হচ্ছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলএনজি আমদানি নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ। দেশীয় উৎস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেওয়ার পাশাপাশি এলএনজি আমদানির একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের হুমকি আর জাহাজে হামলার আশঙ্কায় এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের এই মুখে দাঁড়িয়ে এখন তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, আর এই অচলাবস্থা কাটানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধান ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বললেও ইরানের ‘অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি’ এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে।

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর বুকে এমন একটি জায়গা, যেখানে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি তেলবাহী জাহাজকে অতিক্রম করতে হয়। ওমান ও ইরানের মাঝে প্রসারিত এই ৩৯ কিলোমিটার চওড়া পথটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল অংশের পরিবহন পথ। শুধু তাই নয়, বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ফসফেট ও পটাশ সারের সরবরাহের প্রধান রুটও এটি। এই পথ বন্ধ মানে শুধু পেট্রোল পাম্প শুকানো নয়; বরং ক্ষুধার হাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার মতো বিপদ।

গত চার সপ্তাহ ধরে ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে একের পর এক হুমকি, কয়েকটি ট্যাংকারে রহস্যজনক বিস্ফোরণ এবং সাম্প্রতিক সময়ে এক জাপানি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছে না। বিমা কোম্পানিগুলো এই রুটে যাতায়াতের জন্য প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ফলে অধিকাংশ জাহাজই এখন হয় আদেন উপসাগরে আটকে রয়েছে, নয়তো কেপ অব গুড হোপের মতো দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করছে, যা যাতায়াতের সময় ও খরচ প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে।

ইরানের অস্ত্র: সস্তা ড্রোন ও ভূগোলের খেলা

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এত কঠিন কেন? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে যা প্রচলিত সামরিক শক্তির জবাব দেওয়া কঠিন। প্রথমত, সস্তা ড্রোন ও সমুদ্রমাইনের মতো ‘অপ্রচলিত’ অস্ত্র। একটি মার্কিন ধ্বংসকারী জাহাজের দাম যেখানে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ইরানের একটি ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক হাজার ডলার। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। হরমুজ প্রণালির উত্তর তীর সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই সংকীর্ণ জলপথ থেকে তারা সহজেই ছোট দ্রুতগতির বোট ও ড্রোন পাঠিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোর পাহারা দিতে পারলেও প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক কনভয়ে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। ইরান পুরো প্রণালিকেই ‘বহিষ্কৃত অঞ্চল’ ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছে। আর সেই হুমকি তারা কার্যকর করছে প্রতিনিয়ত।

ট্রাম্পের দ্বিধা: কূটনীতি না কামান?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে এই সংকটের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়ালে তা পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধের রূপ নিতে পারে—যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত নির্বাচনের আগে চান না। তাই তিনি এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথাও বলছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সংকটের প্রভাব: দাম বাড়ছে, সরবরাহ কমছে

জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতোমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অবরোধ না কাটে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি হবে এক ‘কালো সোমবার’। বাংলাদেশের মতো দেশ, যার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর, সেখানেও দাম বাড়ার ধাক্কা পড়বে বহুমাত্রিক।

যে চাঁদে অ্যাপোলো মিশন কেবল পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছিল, সেখানে এবার বসতি গড়ার ডাক দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। শুধু নভোচারী পাঠানো নয়, সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ ও মহাকাশের গভীরে অভিযানের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাপরিকল্পনা সম্প্রতি ‘ইগনিশন’ অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই উদ্যোগে নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, এখন প্রতিযোগিতা ‘বছরের’ নয়, ‘মাসের’ হিসাবে গণনা করা হবে।

‘অসম্ভবকে সম্ভব’-এর নতুন সংজ্ঞা

নাসার নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান, যিনি নিজেও বেসরকারি মহাকাশ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর প্রথম বার্তায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন সময়ের মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নাসা আবারও প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাঁদে ফেরা, সেখানে একটি ঘাঁটি তৈরিসহ মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এই ঘোষণা কেবল একটি মিশনের সময়সীমা নির্ধারণ নয়; এটি পুরো কৌশলগত দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। নাসা এখন ‘বারবার যাওয়া’র প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায়। এর অর্থ, চাঁদে যাওয়া আর কোনো বিরল ঘটনা থাকছে না। বরং, পৃথিবীর কোনো প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে নিয়মিত ফ্লাইটের মতো চাঁদেও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা এক সময়ের কল্পবিজ্ঞান হলেও আজ বাস্তবতার পথে।

আর্টেমিসের নতুন অধ্যায়: ছয় মাস অন্তর মিশন

এই পরিকল্পনার প্রথম মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’। ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনের মাধ্যমে আবারও মানবপা পড়বে চাঁদের মাটিতে। তবে সেখানেই থামছে না গল্প। তার পরবর্তী সময় থেকে ছয় মাস অন্তর নিয়মিত মিশন পাঠানোর রোডম্যাপ তৈরি করেছে নাসা। এই মিশনগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেগুলো হবে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের ধাপ।

‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’ নামে পরিচিত এই ঘাঁটিতে থাকবে আবাসিক ইউনিট, গবেষণাগার ও যানবাহন পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এই ঘাঁটি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, কারণ সেখানে সূর্যালোকের পাশাপাশি বরফাকৃতির পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা থেকে অক্সিজেন, পানি ও জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব।

নতুন প্রশাসকের বক্তব্যে ‘মাসের হিসাবে’ প্রতিযোগিতার যে উল্লেখ রয়েছে, তা কেবল সময়গত বিষয় নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। চীনও তাদের ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন’ (আইএলআরএস) তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে চাঁদের মাটিতে এখন কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, সেখানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়, তাদের মিত্র ও বেসরকারি অংশীদারদের নিয়ে গড়া এই কাঠামোই হবে চাঁদের প্রথম মানবিক বসতি।

নাসার এই পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (এইচএলএস) তৈরিতে প্রতিযোগিতা করছে। নাসা আর নিজে একা সব কিছু তৈরি করছে না; বরং তারা প্রযুক্তি কিনছে এবং বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে ‘পরিবহন ব্যবসায়ী’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই পদ্ধতি মিশনের ব্যয় কমিয়ে আনার পাশাপাশি গতি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, এই চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণের লক্ষ্য শেষ কথা নয়। নাসা স্পষ্ট করে বলেছে, চাঁদ হবে মঙ্গল ও তার বাইরের মহাকাশে মানব অভিযানের ‘প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড’ বা প্রস্তুতির মঞ্চ। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ও রেডিয়েশন পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেই মানবজাতি পরবর্তী লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহের দিকে পা বাড়াবে।

আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে নেপালের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা হয়েছে। ‘বালেন’ নামে পরিচিত র্যাপার ও প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহ দেশের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত বছর জেন-জেডের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এই শপথগ্রহণ হলো। শপথের আগের রাতে প্রকাশ করা এক র্যাপ গানে তিনি ‘অবিভক্ত নেপালি’ হয়ে ইতিহাস গড়ার আহ্বান জানান, যা কয়েক ঘণ্টায় ২০ লাখের বেশি দর্শক দেখেছে ।

শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, একজন কাঠামো প্রকৌশলী এবং জনপ্রিয় র্যাপার। ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থান পেয়েছেন এবং তিনিই প্রথম মধেশি অঞ্চল থেকে দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে আসীন হলেন ।

শপথ নেওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে গান প্রকাশ করে তিনি দেখিয়ে দিলেন, জনতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যম এখনও মঞ্চ ও মাইক। ‘জয় মহাকালী’ শিরোনামের এই গানে তিনি গেয়েছেন, ‘আমার হৃদয় সাহসে ভরা, লাল রক্ত ফুঁড়ে উঠছে; আমার ভাইয়েরা আমার পাশে, এবার আমরা জেগে উঠবো।’ প্রচারণার ভিডিওতে ঘেরা এই গানের একটি লাইন যেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে চিহ্নিত করে: ‘আমার নিঃশেষ হোক না শ্বাস, আমি চিতাবাঘের গতিতে দৌড়াবো’ ।

প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল নেপালের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য উদাহরণ। রাষ্ট্রপতি ভবন ‘শীতল নিওয়াস’-এ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাতটি শঙ্খের ধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। ১০৮ জন হিন্দু ‘বটুক’ (যুব ব্রাহ্মণ) বেদ মন্ত্র পাঠ করেন এবং ১০৭ জন বৌদ্ধ লামা ‘মঙ্গল বচন’ পাঠ করেন। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাউডেল সংবিধানের ৭৬(১) ধারার অধীনে তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান ।

শপথগ্রহণে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’, মাধব কুমার নেপালসহ অনেকে। তবে চারবারের প্রধানমন্ত্রী ও ঝাপা-৫ আসনে বালেন্দ্র শাহর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত কে পি শর্মা অলির অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। জি-৫ আসনে বালেন পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট, যেখানে অলি পেয়েছেন মাত্র ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট ।

‘জেন-জেডের আদেশ’ এবং চ্যালেঞ্জের মেয়াদ

বালেনের এই অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ নির্বাচনী জয় নয়। এটি ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ গণআন্দোলনের ফলাফল। সে সময় সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারান। সেই আন্দোলনের মাধ্যমেই কার্যত উৎখাত হন কে পি শর্মা অলি। সেই শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সুষিলা কার্কি বিদায়বেলায় বলেছেন, ‘জনগণ জেন-জেড আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছেন’ ।

কার্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, তরুণ নেতৃত্বে নতুন সরকার দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের মধ্যেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে বালেনকে সামনে নিয়ে আসা সেই আন্দোলনের তদন্ত প্রতিবেদন এখন তাঁর সামনেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৬৩ জনের মধ্যে ৪৮ জনের বুক ও মাথায় গুলি লেগেছে ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই বালেন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রতিরক্ষা ও শিল্প মন্ত্রক নিজের কাছে রেখে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন স্বর্ণিম ওয়াগ্লেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সুধান গুরুং, আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আছেন শিশির খানাল ।

জিভের ডগায় আগুন, চোখেমুখে পানি—অথচ বারবার বাড়িয়ে নেওয়া সেই ঝালের কামড়। শুধু স্বাদের নেশা না, যাঁরা ঝাল খেতে ভালোবাসেন, তাঁদের এই অভ্যাস আসলে এক ধরনের ‘দুঃসাহসিক অভিযান’। সাম্প্রতিক নিউরোসায়েন্টিফিক গবেষণা বলছে, এই ঝালপ্রীতি শুধু রসনাবিলাস নয়, এর ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিত্ব, মনস্তত্ত্ব আর দেহের এক জটিল রাসায়নিক সমীকরণ। আজকের প্রতিবেদনে জানব, কেন পৃথিবীর এক বড় অংশের মানুষ স্বেচ্ছায় এই ‘যন্ত্রণা’ বরণ করে নেন এবং এই অভ্যাস তাদের ব্যক্তিত্বের কোন দিকটির ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালা নয়, উৎকণ্ঠার মোড়ক

ঝাল খাওয়া মানেই মূলত ক্যাপসাইসিন নামক একটি যৌগের সঙ্গে লড়াই করা। মরিচের এই উপাদানটি আমাদের জিভের TRPV1 রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে—যে রিসেপ্টর সাধারণত ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা শনাক্ত করে। অর্থাৎ, মরিচ খেলে মস্তিষ্ক ভুল বুঝে মনে করে, মুখের ভেতর আগুন জ্বলছে।

কিন্তু যাঁরা এই অনুভূতি পছন্দ করেন, তাঁরা ঠিক কী পান? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যক্তিরা এক ধরনের ‘বিবিধ সংবেদনশীলতা’ (Sensation Seeking) নিয়ে থাকেন। তাঁরা জানেন এটা জ্বালা, কিন্তু এই জ্বালা কাটিয়ে ওঠার পর মস্তিষ্ক যে ‘এন্ডরফিন’ নিঃসরণ করে, তা আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক মাদক। ঝাল খাওয়ার পর যে হালকা উৎকণ্ঠা আর তার পরের স্বস্তি আসে, তা অনেকটা রোলার কোস্টারে চড়ার মতো—ভয় আর রোমাঞ্চের এক বিমূর্ত মিশ্রণ।

বৈজ্ঞানিক কারণ: কেন বারবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা?

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ঝাল খান, তাঁদের শরীর ধীরে ধীরে ক্যাপসাইসিনের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে। তবে এর বাইরেও এই ঝালপ্রীতি জিনগতভাবে নির্ধারিত হতে পারে। ‘ডেইলি মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাঁদের মধ্যে ‘ডোপামিন’ রিসেপ্টরের তারতম্য বেশি, তাঁরা সাধারণত ঝাল খেতে বেশি পছন্দ করেন। ডোপামিন আমাদের আনন্দের অনুভূতি জাগায়। যখন কেউ ঝাল খান, মস্তিষ্ক ভাবে তাঁকে ‘বিপদ’ থেকে বাঁচাতে এন্ডোরফিন ছাড়ে, আর এন্ডোরফিন ডোপামিনের উৎপাদন বাড়ায়। অর্থাৎ, ঝাল খাওয়া আসলে একটা রাসায়নিক পুরস্কার।

এছাড়াও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঝাল খাওয়ার সঙ্গে ‘টেস্টোস্টেরন’ হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষদের মধ্যে ঝালপ্রিয়তা বেশি দেখা গেলেও, বর্তমানে নারীদের মধ্যেও এর প্রবণতা বাড়ছে। এটি শুধু ‘পুরুষসুলভ’ চ্যালেঞ্জ না, বরং আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও সহনশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঝালপ্রিয় মানুষ: ব্যক্তিত্বের কয়েকটি রেখাচিত্র

সামাজিক আচরণ বিশ্লেষকদের মতে, যাঁরা খাবারে অতিরিক্ত ঝাল দিতে পছন্দ করেন, তাঁরা সাধারণত:

  • সাহসিক ও ঝুঁকিপ্রবণ: নতুন কিছু চেষ্টা করতে তাঁরা কখনো পিছপা হন না। শুধু খাবার নয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁরা বাঁধা ভাঙতে পছন্দ করেন।

  • সহনশীলতা বেশি: ঝাল খাওয়ার মধ্যে রয়েছে ধৈর্যের পরীক্ষা। যাঁরা এটি সহজে নেন, তাঁরা জীবনের জটিল পরিস্থিতিও তুলনামূলক শান্তভাবে মোকাবিলা করেন।

  • সামাজিকভাবে সক্রিয়: ঝাল খাওয়া প্রায়ই সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ। ‘চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়া, প্রতিযোগিতা করা—এসব তাঁদের জন্য বন্ধনের সেতু।

গরমের দেশে ঝালের রাজনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ঝাল খাওয়া শুধু ব্যক্তিত্বের বিষয় নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঝাল খাওয়ার একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। ঝাল শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ঘাম বাড়ায়, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আর্দ্র আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া নাশক হিসেবে মরিচের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ফলে, যাঁরা এখানে ঝাল খান, তাঁরা হয়তো অজান্তেই স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ঐতিহ্যের ধারক।

ঝালের নেশা কি ঠিক?

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতি ঝাল খাবার যেমন ‘ক্যারোলিনা রিপার’ বা ‘ঘোস্ট পেপার’-এর মতো চরম মাত্রার ঝাল খেলে পাকস্থলীর ক্ষতি হতে পারে। তবে পরিমিত মাত্রায় ঝাল খাওয়া বিপাকক্রিয়া বাড়ায়, ওজন কমায় এবং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।