মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং তেহরানের পাল্টা আক্রমণের জেরে বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা দীর্ঘদিনের জন্য বিলম্বিত। দুবাই, দোহা, আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ হাব বন্ধ থাকায় লাখো যাত্রী আটকে পড়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোতেও বড় ধাক্কা লেগেছে—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শত শত প্রবাসী ও ট্রানজিট যাত্রী বিপাকে। এমন সংকটে যাত্রীদের অধিকার কী, তা জানা এখন অত্যন্ত জরুরি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা আক্রমণ করে। এতে ইরান, ইসরায়েল, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সিরিয়া, জর্ডানসহ একাধিক দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ হয়ে যায়।

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—বিশ্বের ব্যস্ততম হাব—তিন দিন ধরে বন্ধ। দোহা ও আবুধাবির হামাদ ও জায়েদ বিমানবন্দরও একই অবস্থা। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ৩ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এই সংখ্যা কোভিড মহামারির পর সবচেয়ে বড় বিঘ্ন।

বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়েছে তীব্রভাবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ১০০-এরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

এর মধ্যে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, এয়ার আরাবিয়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ বড় বড় ক্যারিয়ারের ফ্লাইট রয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরেও ২০টির মতো ফ্লাইট বাতিল।

হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক, উমরাহ যাত্রী ও ইউরোপ-আমেরিকাগামী ট্রানজিট যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন। অনেকে রাত কাটিয়েছেন টার্মিনালে, খাবার-পানীয়ের অভাবে কষ্ট পেয়েছেন। কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইসি ২৬১/২০০৪ নিয়ম বা অনুরূপ আইনের আওতায় পড়ে। যুদ্ধ বা ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ (extraordinary circumstances) হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এয়ারলাইনগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয়। তবে তারা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বাধ্য।

– ফ্লাইট বাতিল হলে এয়ারলাইনকে অবশ্যই বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে বা পুরো টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হবে।
– দীর্ঘ বিলম্ব বা বাতিলের ক্ষেত্রে খাবার, পানীয়, হোটেল থাকার ব্যবস্থা ও বিমানবন্দর-হোটেল যাতায়াতের সুবিধা দিতে হবে।
– যাত্রী যদি আর ভ্রমণ না করতে চান, তাহলে পুরো রিফান্ড পাওয়ার অধিকার আছে।
– বাংলাদেশি এয়ারলাইনগুলোর ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) ও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

বিমান সংস্থাগুলো যেমন এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, বিমান বাংলাদেশ—সবাই যাত্রীদের বিকল্প তারিখে ফ্লাইট বা রিফান্ডের অফার দিচ্ছে। কিন্তু ফোন লাইন জ্যাম, ওয়েবসাইটে ভিড়—এসবের কারণে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই বিঘ্ন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার এনার্জি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইউরোপের পাইকারি গ্যাস বাজারে দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) এই ঘোষণার পর ডাচ টিটিএফ হাবের দাম ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছেছে।

কাতার এনার্জি, যা বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, রাস লাফান শিল্পনগরীতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করেছে। এই স্থাপনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে এশিয়া ও ইউরোপে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাঠানো হয়।

কাতার এনার্জির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পনগরীতে সামরিক হামলার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে।” পুনরায় চালু করার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি, যা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা থেকে উদ্ভূত, ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং কাতার-সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমস্ত এলএনজি রপ্তানি হয়।

ইরানের হামলা কাতারের অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জলের ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট হতে পারে।

ইউরোপ, যা ২০২২ সালের পর রাশিয়ান পাইপলাইন গ্যাস থেকে মুখ ফিরিয়ে কাতারের এলএনজির উপর নির্ভরশীল হয়েছে, এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কাতার ইউরোপের এলএনজি আমদানির ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে। সোমবার সকালে দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও, উৎপাদন বন্ধের খবরে তা ৫০ শতাংশে পৌঁছে।

ডাচ টিটিএফ, যা ইউরোপের বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত, ফ্রন্ট-মান্থ চুক্তির দাম ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি এমডব্লিউএইচ হয়েছে, যা প্রায় ১৫.৯২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউয়ের সমান। এই দামবৃদ্ধি গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

ডাচ টিটিএফ হাব ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের মূল নির্ধারক। এটি একটি নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ-চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সরবরাহের ঘাটতি এই প্রক্রিয়াকে অস্থির করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে, যা ইউরোপের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

এশিয়া, যা কাতারের এলএনজির প্রধান গ্রাহক,ও এই সংকটে প্রভাবিত। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা বিশ্বব্যাপী দামবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতে, হরমুজ প্রণালী অবরোধ অব্যাহত থাকলে এশিয়া ও ইউরোপে দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানিকারকরা, যেমন চেনিয়ার এনার্জি, এতে লাভবান হচ্ছে, তাদের শেয়ার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবকে তুলে ধরেছে। তেলের দামও ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো বিকল্প সরবরাহ খুঁজছে, কিন্তু শীতকালে এটি চ্যালেঞ্জিং।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে গোপন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে। সিআইএ কয়েক মাস ধরে খামেনির অবস্থান এবং চলাচল নজরে রেখে তথ্য সংগ্রহ করে, যা ইসরায়েলকে সেই মারাত্মক হামলার জন্য সহায়তা করে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, খামেনির অবস্থান এবং দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা গড়ে উঠেছিল। শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, যেখানে খামেনি উপস্থিত থাকবেন। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিআইএ ইসরায়েলের সঙ্গে শেয়ার করে, যা হামলার সময় নির্ধারণে সহায়ক হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘শিল্ড অব জুডাহ’ নামে পরিচিত। এই হামলা মূলত রাতে পরিকল্পিত ছিল, কিন্তু সিআইএর তথ্যের ভিত্তিতে তা এগিয়ে আনা হয়। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সিআইএর সমন্বয়ে এই অভিযানে খামেনি এবং অন্যান্য নেতাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। ফলে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক এবং সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রক্সি গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুক্ততা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান নিয়মিত। ২০১৮ সালে ইরানের গোপন নথি চুরির ঘটনা থেকে শুরু করে স্টাক্সনেট সাইবার হামলা—সবকিছুতেই এই সহযোগিতা দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলায়ও এই যৌথতা স্পষ্ট। খামেনির ক্ষেত্রে সিআইএর ‘হাই ফিডেলিটি’ তথ্য ইসরায়েলকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সাহায্য করে।

এই ঘটনার পটভূমিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শত্রুতা। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহ, হুতি বিদ্রোহীদের মতো গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেওয়া ইসরায়েলের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই হামলা ইরানের শাসনব্যবস্থা উল্টে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত। তবে এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধকে উসকে দিয়েছে বলে সমালোচনা উঠেছে। ইরান পালটা হামলা চালিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, খামেনির মৃত্যু ইরানের অভ্যন্তরে ক্ষমতা সংগ্রামকে তীব্র করবে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। তবে এটি ইরানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যেমনটি ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এই কৌশল সফল হবে কি না, তা সময় বলবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশের সংবিধান অনুসরণ করে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিল নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবে, যাতে ৬৭ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।

খামেনির মৃত্যু ইরানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গত ৩৭ বছর ধরে দেশের ধর্মীয়, সামরিক এবং রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ-কে নিয়ে গঠিত।

কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য এবং এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের দ্বারা নির্বাচিত। ১৯৫৯ সালে ইয়াজ্দ প্রদেশের মেয়বোদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণকারী আরাফি কোমের প্রখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং ইরানের সেমিনারিগুলোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরাফি শিয়া মতবাদ প্রচারে সক্রিয় এবং সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ধর্মীয় আদর্শ ছড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন। ২০১৯ সাল থেকে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি ইরানের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচনের দায়িত্ব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর উপর। এই ৮৮ সদস্যের সংস্থা শিয়া ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত, যারা প্রতি আট বছরে নির্বাচিত হয়। খামেনির মৃত্যুর পর এই অ্যাসেম্বলি দ্রুত একটি নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে এই প্রক্রিয়া গোপনীয় এবং ধর্মীয় যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপ্লবী আদর্শের উপর নির্ভর করে। অতীতে খোমেনির পর খামেনির নির্বাচনও এমনই দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়েছিল।

এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক। খামেনির নেতৃত্বে ইরান পরমাণু কর্মসূচি, হিজবুল্লাহ এবং হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁর মৃত্যু এবং চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাউন্সিলকে সামরিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিদেশনীতিতে বড় পরিবর্তন হবে না, তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সংগ্রাম দেখা দিতে পারে।

আরাফির ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিপ্লবী মতাদর্শের অনুসারী এবং খামেনির বিশ্বস্ত বলে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে কাউন্সিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে থাকায় এই কাউন্সিলের প্রথম পরীক্ষা হবে যুদ্ধ পরিচালনা।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে সেখানকার বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবস্থা জানতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

রোববার সকালে সচিবালয়ে এই সাক্ষাতে যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে, এবং প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সকালে দেখা করেন। ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশিরা কী অবস্থায় আছেন, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের ফলে অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা প্রবাসীদের ফিরতে বাধা সৃষ্টি করছে।”

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা বিপুল—আনুমানিক ৮ মিলিয়ন বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন, যা দেশের মোট প্রবাসীদের প্রায় ৬০ শতাংশ। সৌদি আরবে একাই প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। এই অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাবে তাদের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে হুমকি দেখা দিয়েছে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে বিমানবন্দর বন্ধ, বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় অনেকে আটকে পড়েছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর দুবাই, দোহা, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা বাংলাদেশি প্রবাসীদের দেশে ফেরার পথে বড় বাধা। উদাহরণস্বরূপ, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক হাব—পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে কাতার, কুয়েত, ইরাক, ইরানসহ অনেক দেশে ফ্লাইটের ৫০ শতাংশেরও বেশি বাতিল হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিপদজনক। উপসাগরীয় যুদ্ধ বা সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনায় প্রবাসীদের জীবনহানি, চাকরি হারানো এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো গাল্ফ দেশগুলোতে প্রবাসীদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে। যুদ্ধের কারণে শ্রমিকরা শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা, বেতন অপ্রাপ্তি এবং শোষণের শিকার হন। এছাড়া, অবৈধ প্রবাসীরা আটক হলে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠক নতুন সরকারের প্রবাসী কল্যাণে অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে ১৯৭৬ সাল থেকে। যুদ্ধের ফলে এই প্রবাহ কমলে দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। সরকারকে প্রবাসীদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে, যেমন সুরক্ষা সেল গঠন বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সচিবালয়ে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মাকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের খবর যেন না শোনা যায়।

রোববার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এই কথা জানান, যা দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

এদিন সকালে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে সচিবালয়ে আসেন। নতুন সরকার গঠনের পর এটি ছিল তাঁর রুটিন সাক্ষাৎ, কিন্তু আলোচনায় সীমান্ত নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “আমি হাইকমিশনারকে বিশেষভাবে বলেছি, সীমান্ত হত্যা যেন আর না হয়। বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যে নিয়মিত বৈঠক চালিয়ে যাওয়া দরকার, যাতে এমন ঘটনা যতটা সম্ভব এড়ানো যায়।”

বাংলাদেশ-ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা স্থলসীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্তে গত কয়েক দশকে শত শত বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফ-এর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গরু চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অন্যান্য কারণে এসব ঘটনা ঘটে, যা দুই দেশের সম্পর্কে চিড় ধরায়। বিশেষ করে ২০১০-২০২০ সালের মধ্যে হত্যার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমলেও, এখনও প্রতি বছর কয়েকজনের মৃত্যুর খবর আসে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জন্মায়।

এই বৈঠকের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সবকিছুতেই গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। ভারতীয় পক্ষ ভিসা সেবা ধাপে ধাপে পুরোপুরি চালু করার আশ্বাস দিয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা নতুন নয়। ২০১১ সালে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ‘কো-অর্ডিনেশন কনফারেন্স’ শুরু হয়, যাতে এসব ঘটনা কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে, মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সরাসরি বার্তা এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের সাড়া দেওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন সরকারের অধীনে এই ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।

ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রখ্যাত জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জির একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সোমবার (২ মার্চ) বাজার খোলার সাথে সাথে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি অন্তত ২০ ডলার বেড়ে যেতে পারে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।

এই যৌথ হামলা গত সপ্তাহে শুরু হয়েছে, যখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের তেল অবকাঠামো এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। ইরানের পালটা হামলায় হরমুজ প্রণালির উভয়পাশে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, ফলে এই সংকীর্ণ জলপথে তেল ট্যাঙ্কারসহ সব ধরনের জাহাজের চলাচল কার্যত স্থগিত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী—প্রতিদিন এখান দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে প্রবাহিত হয়। এই অবরোধের ফলে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাইস্ট্যাড এনার্জির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সংকটের প্রধান কারণ হলো হরমুজের অবরোধ। সংস্থাটির বিশ্লেষকরা বলছেন, বিকল্প পথ যেমন লোহিত সাগর বা পাইপলাইন ব্যবহার করে কিছু তেল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও, প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেলের নিট ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। এতে করে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে, যা এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত এবং চীনের মতো বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এই সংকট একটি দুঃস্বপ্নের মতো।

পটভূমিতে, ইরান-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এই হামলাকে ত্বরান্বিত করেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ততা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে, যদিও জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দেশগুলো এটিকে নিন্দা করেছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা আরও গভীর হয়েছে, যা তেলের দামের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইতিহাস বলে, ১৯৭৯ সালের ইরানী বিপ্লব বা ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো ঘটনায় তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এবারও সেই আশঙ্কা প্রবল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পেট্রোল, ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন এবং খাদ্যপণ্যের খরচও বাড়বে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে তেল আমদানির উপর অর্থনীতি নির্ভরশীল। সরকারগুলোকে স্টকপাইলিং এবং বিকল্প শক্তি উৎসের দিকে নজর দিতে হবে।