গরমে চৈত্রের শেষে বৈশাখের আগুন জ্বলছে শহর-গ্রামে। তাপমাত্রা যখন ৩৮ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই, তখন শরীরের ভিতর-বাহির দুই জায়গায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। গরমে সুস্থ থাকার নামে অনেকেই অজান্তেই নিজের ক্ষতি করছেন। প্রচণ্ড দাবদাহে কী করবেন না আর কী খাবেন—এই দুই প্রশ্নের সঠিক উত্তরই আজ নির্ধারণ করে দিতে পারে আপনার সুস্থতার মাপকাঠি।
গরম পড়লেই স্বস্তির সন্ধানে মানুষ ছোটে এসি, ফ্রিজ আর ঠান্ডা পানীয়ের দিকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘স্বস্তি’ অনেক সময়েই বিপদ ডেকে আনে। দীর্ঘ ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, প্রতিবছর এই মৌসুমেই হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন আর খাদ্যে বিষক্রিয়ার রোগীদের সংখ্যা হাসপাতালে দ্বিগুণ হয়ে যায়। তবে শুধু চিকিৎসা নয়, আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসই এই সমস্যার মূল।
প্রথমত, গরমে যা ‘করবেন না’, সেটা পরিষ্কার করে জেনে নেওয়া জরুরি। অনেকেই মনে করেন, প্রচণ্ড গরমে অফিস বা বাড়ি ফিরেই বরফ ঠান্ডা পানি গলাধঃরণ করলে শরীর ঠান্ডা হবে। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, এতে হজমশক্তি একেবারে থমকে যায়। হঠাৎ করে তাপমাত্রার এই তারতম্য শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এছাড়া ঘামতে ঘামতে এসির সামনে দাঁড়ানো, অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল সেবন—এগুলো শরীর থেকে পানি শুষে নিয়ে ডিহাইড্রেশনকে আমন্ত্রণ জানায়।
পাতে কী রাখবেন, কী এড়াবেন?
গরমের খাবার তালিকা হওয়া উচিত সহজপাচ্য ও পানীয়সমৃদ্ধ। এই সময় শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘ওয়াটার-রিচ ফুড’ বা পানিযুক্ত খাবারের বিকল্প নেই। তরমুজ, শসা, বেল, আনারসের মতো ফল প্রতিদিনের তালিকায় রাখতে হবে। কিন্তু সতর্ক থাকবেন, রাস্তার কাটা ফল বা দীর্ঘক্ষণ খোলা রাখা জুস একেবারেই নয়। এসব খাবারে মাছি বসে, যা ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের জীবাণু বহন করে।
এছাড়া গরমে ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত মশলাদার ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাবার হজম হতে সময় নেয়, ফলে শরীরে তাপ উৎপাদন বেড়ে যায়। বরং ঘরে তৈরি টকদই, ঘোল, ডাবের পানি, লেবুর শরবত—এগুলো প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটের ভাণ্ডার। সকালে উঠে এক গ্লাস পানি সাথে লেবু ও মধু মিশিয়ে খাওয়ার অভ্যাস আপনাকে সারাদিন সতেজ রাখবে।
বিশেষ সতর্কতা: শিশু ও বয়স্করা
এই প্রতিবেদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দুটি গ্রুপ হলো শিশু ও বয়স্করা। শিশুদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয় না, আর বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনেক সময় তৃষ্ণার অনুভূতি কম কাজ করে। ফলে তারা অজান্তেই ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়েন।
সুতরাং, পরিবারের বড় সদস্যদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে—তারা সময়মতো পানি পান করছেন কিনা। আর শিশুদের জন্য বাইরের খাবার এড়িয়ে ঘরেই পুষ্টিকর ঠান্ডা খাবার তৈরি করে দেওয়া উচিত।
কী করবেন: এক নজরে
-
পানীয়: ঘোল, ডাবের পানি, ফলের রস (চিনি ছাড়া), লেবুর শরবত।
-
খাবার: শসা, তরমুজ, পেঁপে, ওটস, ইয়োগার্ট।
-
পোশাক: সুতি ও হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।
-
সময়: দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে রোদে বেরোনো এড়িয়ে চলুন।
গরম কেবল বাইরের তাপমাত্রা নয়, এটি আমাদের জীবনযাত্রার ওপর চাপিয়ে দেয় এক নতুন শৃঙ্খলা। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ’ এখানেই বেশি জরুরি।


