TT Ads

১৮ শতকের শেষভাগে, অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষ দিকে, জার্মানির প্রুশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী ইউজেন স্যান্ডো (আসল নাম ফ্রিডরিখ উইলহেল্ম মুলার) বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন শারীরিক সৌন্দর্য ও শক্তির অসাধারণ সমন্বয়ের জন্য। তাঁকে আধুনিক বডি বিল্ডিংয়ের জনক বলা হয়। বিচিত্র হাতাকাটা পোশাক পরে মঞ্চে পেশি প্রদর্শন করে তিনি শুধু শক্তিশালী নন, সৌন্দর্যের আদর্শও হয়ে ওঠেন—এবং এরই ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ নামে পরিচিত হয় সেই স্লিভলেস ভেস্ট।

ইউজেন স্যান্ডোর জন্ম ১৮৬৭ সালের ২ এপ্রিল প্রুশিয়ার কোনিগসবার্গে (বর্তমানে রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ)। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন দুর্বল ও রোগা। ১০ বছর বয়সে ইতালিতে গিয়ে প্রাচীন গ্রিক-রোমান মূর্তিগুলো দেখে মুগ্ধ হন। সেই মূর্তির নিখুঁত শরীরের অনুপাত দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের শরীরকেও সেই আদর্শে গড়ে তুলবেন। পরিবার চেয়েছিল তিনি লুথারান পাদ্রি হোন, কিন্তু স্যান্ডো সেই পথ ছেড়ে সার্কাসে অ্যাক্রোব্যাট হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে জার্মান স্ট্রংম্যান প্রফেসর অ্যাটিলার শিষ্য হয়ে শারীরিক প্রশিক্ষণ নেন।

১৮৮৯ সালে লন্ডনে এসে তিনি তৎকালীন ‘সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ’ চার্লস স্যাম্পসনকে চ্যালেঞ্জ করেন। মঞ্চে প্রথমে হাসাহাসি হয়—স্যান্ডো দেখতে সাধারণ মানুষের মতো। কিন্তু পোশাক খুলে পেশি দেখানোর পর দর্শকরা স্তম্ভিত। তিনি শুধু ভারী ওজন তুললেন না, ‘মাসল ডিসপ্লে পারফরম্যান্স’ নামে পোজ দিয়ে শরীরের সৌন্দর্য প্রদর্শন করলেন। এটাই ছিল আধুনিক বডি বিল্ডিংয়ের শুরু—শক্তির সঙ্গে নান্দনিকতার মিলন।

স্যান্ডো বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড হয়ে ১৯০৫ সালে ভারতে আসেন। সেখানে তিনি যে হাতাকাটা টাইট-ফিটিং পোশাক (সিঙ্গলেট বা ট্যাঙ্ক টপের মতো) পরতেন, তা দর্শকদের মনে গেঁথে যায়। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে সেই পোশাক। ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায়, ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ নামে পরিচিত হয় এই স্লিভলেস অন্তর্বাস। অনেকের মতে, এই নামকরণ সরাসরি তাঁর থেকে অনুপ্রাণিত। যদিও কিছু গবেষক বলেন, এটি ‘গানজি’ (ব্রিটিশ নাবিকদের উলের সোয়েটার) থেকেও আসতে পারে, তবু স্যান্ডোর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

স্যান্ডো শুধু পারফর্মার ছিলেন না, উদ্যোক্তাও। তিনি ‘ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্যাল কালচার’ খোলেন, ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি বিক্রি করেন, ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন এবং বই লেখেন। ১৮৯৭-১৯০৪ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর বইয়ে প্রথম ‘বডি বিল্ডিং’ শব্দটি ব্যবহার হয়। তাঁর আদর্শ ছিল গ্রিক আদর্শ—শরীরের নির্দিষ্ট অনুপাত।

আজও যখন আমরা জিমে ট্যাঙ্ক টপ পরে ব্যায়াম করি বা ‘স্যান্ডো গেঞ্জি’ কিনি, তখন অজান্তেই সেই এক শতাব্দী আগের এক জার্মান যুবকের স্বপ্নকে স্পর্শ করি। ইউজেন স্যান্ডো প্রমাণ করেছিলেন, শরীর শুধু শক্তির নয়, সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাসেরও প্রতীক হতে পারে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *