TT Ads

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ জোরালো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছে একটি ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, যা কার্যত তেহরানের কাছে এক ‘চূড়ান্ত শর্তপত্র’। পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলোপ-এর বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হলেও, ইরানের ভেতরে এখনো এই প্রস্তাব নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে ।

কূটনৈতিক পথে ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ সমাধান

প্রায় এক মাস ধরে চলা সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সমাধানের পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে ইরানের কাছে এই প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে । হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবের লক্ষ্য শত্রুতা বন্ধ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনা । তবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ চললেও সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অব্যাহত থাকবে ।

ইসরায়েলের গণমাধ্যম চ্যানেল ১২ এবং আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এই প্রস্তাবের মূল ভিত্তি হলো ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে ‘প্রতিরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ’ রাখা । বিশেষজ্ঞরা একে ‘ম্যাক্সিমালিস্ট সেটেলমেন্ট’ বা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রস্তাব হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, যা ইরানের কৌশলগত শক্তি পুরোপুরি সংকুচিত করার লক্ষ্যে তৈরি ।

প্রস্তাবের মূল শর্তসমূহ: ‘শূন্য ইউরেনিয়াম’ থেকে ‘মুক্ত প্রণালী’

এখনো পুরো ১৫ দফা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হলেও ইসরায়েলি ও আমেরিকান সংবাদমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো উঠে এসেছে। প্রস্তাবে ইরানের প্রতি প্রধান শর্তসমূহ নিম্নরূপ:

  • পারমাণবিক কর্মসূচি: নাতানজ, ইসফাহান ও ফোর্দোতে অবস্থিত তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে হবে। ইরানের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ এবং সঞ্চিত সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আইএইএ-এর কাছে হস্তান্তর করতে হবে ।

  • ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা জারি। ভবিষ্যতে শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে এবং সীমিত পাল্লা ও সংখ্যায় ক্ষেপণাস্ত্র রাখতে পারবে ইরান ।

  • আঞ্চলিক প্রভাব: ‘প্রক্সি’ বা প্রতিনিধি বাহিনীর মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের নীতি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের শর্ত দেওয়া হয়েছে ।

  • হরমুজ প্রণালী: বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হরমুজ প্রণালী সব দেশের জন্য মুক্ত ও নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে ।

বিনিময়ে ইরান কী পাবে? নিষেধাজ্ঞা উঠছে, শান্তির স্বীকৃতি

যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাবে ইরানের জন্য রয়েছে আর্থিক ও কূটনৈতিক সুবিধা। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ইরান এই শর্ত মেনে নিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের imposed সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে । এছাড়া, বুশেহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ।

এছাড়া ইরানের ওপর থেকে ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়ার হাতছানি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ‘স্ন্যাপব্যাক’ হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনা যায় । প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান ইতিমধ্যে একটি ‘বড় উপহার’ দিয়েছে যা ‘তেল ও গ্যাস সম্পর্কিত’ এবং তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে রাজি হয়েছে । তবে, ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসেনি ।

যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব ইরানের জন্য এক কঠিন দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। একদিকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক মুক্তির সম্ভাবনা, অন্যদিকে ইরানের বৈদেশিক নীতির মূল চালিকাশক্তি ‘প্রক্সি কৌশল’ ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি বিলুপ্ত করার শর্ত । ইরানের ভেতরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা সম্পূর্ণ বিজয় না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে” ।

যদিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শান্তি আলোচনার আয়োজকের ভূমিকা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জবাব দিতে বিলম্ব হতে পারে ।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *