মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি সংকট নেই এবং ভোগান্তির মুখে দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনাও নেই।
আজ বুধবার সরকারের এক মাস পূর্তির সংবাদ সম্মেলনে তিনি জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।
‘মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে পুড়ছে না বাংলাদেশ’
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে প্রভাব ফেললেও বাংলাদেশ এখনো সেই চাপ পুরোপুরি অনুভব করছে না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও কঠিন পরিস্থিতির মুখে আছে। কিন্তু দেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি সংকট নেই। জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনার আহ্বান জানাই।’
মন্ত্রীর দাবি, সরকার ইতিমধ্যেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় যথেষ্ট মজুত ও বিকল্প উৎসের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি আতঙ্কিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় মজুত শুরু করেন, তাহলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ভিত্তিহীন গুজব, সতর্ক থাকার আহ্বান
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের সংকট ও দামবৃদ্ধি নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছিল। কেউ কেউ বলছিলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে পেট্রোল-ডিজেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে’, আবার কেউ কেউ ছড়িয়েছিলেন ‘সংকট শুরু হয়ে গেছে’—এমন ভুয়া খবর। এসব গুজবের জেরে গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে কিছুটা ভিড় দেখা গিয়েছিল।
মন্ত্রী সরাসরি এসব গুজবের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গুজব যারা ছড়াচ্ছে, তাদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর রাখছে। জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যে কোনো সঠিক তথ্য সময়মতো জানানো হবে।’ তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও দ্রুত গুজব শনাক্ত ও প্রতিরোধে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জ্বালানি বিভাগ যা বলছে
সরকারের এই ঘোষণার আগেই জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে বর্তমানে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মজুত স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি। সরকারি সংস্থা বিপিসি জানিয়েছে, আগামী তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো মজুত রয়েছে। এছাড়া দেশের তেল পরিশোধনাগারগুলো পুরোদমে চালু আছে এবং আমদানি প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। সরকারের সময়মতো এই ঘোষণা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের এক মাস: জ্বালানি ছাড়াও কী বললেন মন্ত্রী
আজকের সংবাদ সম্মেলনটি ছিল সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত। জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গের পাশাপাশি মন্ত্রী সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথাও তুলে ধরেন। তবে জ্বালানি প্রসঙ্গটিই আজকের সংবাদ সম্মেলনের মূল আকর্ষণ ছিল।
মন্ত্রী জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও কাজ করছে সরকার। খোলাবাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গুজব ও অপপ্রচারের বিপরীতে জনগণকে যুক্তিযুক্ত আচরণের পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানি নিয়ে সরকারের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও বিশ্ববাজারের ওঠানামার মধ্যেও বাংলাদেশ এখনো ‘সেফ জোন’-এ আছে বলে দাবি করছে সরকার।
তথ্যমন্ত্রীর বার্তা পরিষ্কার—আপাতত জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, দাম বাড়ছে না, সংকট নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে বিশ্ব পরিস্থিতি ও সরকারের নেওয়া সঠিক পদক্ষেপের ওপর। আপাতত জনগণের কর্তব্য, গুজবে কান না দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় মজুত থেকে বিরত থাকা। সরকার যে বলছে, ‘যা আছে, তা যথেষ্ট’—এবার দেখার পালা, সেই বার্তা কতটা কার্যকর হয় জনমনে।


