ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রখ্যাত জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্ট্যাড এনার্জির একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সোমবার (২ মার্চ) বাজার খোলার সাথে সাথে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি অন্তত ২০ ডলার বেড়ে যেতে পারে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।
এই যৌথ হামলা গত সপ্তাহে শুরু হয়েছে, যখন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের তেল অবকাঠামো এবং সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। ইরানের পালটা হামলায় হরমুজ প্রণালির উভয়পাশে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, ফলে এই সংকীর্ণ জলপথে তেল ট্যাঙ্কারসহ সব ধরনের জাহাজের চলাচল কার্যত স্থগিত। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী—প্রতিদিন এখান দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে প্রবাহিত হয়। এই অবরোধের ফলে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাইস্ট্যাড এনার্জির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সংকটের প্রধান কারণ হলো হরমুজের অবরোধ। সংস্থাটির বিশ্লেষকরা বলছেন, বিকল্প পথ যেমন লোহিত সাগর বা পাইপলাইন ব্যবহার করে কিছু তেল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও, প্রতিদিন ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেলের নিট ঘাটতি অবশ্যম্ভাবী। এতে করে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে, যা এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত এবং চীনের মতো বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এই সংকট একটি দুঃস্বপ্নের মতো।
পটভূমিতে, ইরান-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এই হামলাকে ত্বরান্বিত করেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোর সাথে যুক্ততা ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে, যদিও জাতিসংঘ এবং অন্যান্য দেশগুলো এটিকে নিন্দা করেছে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা আরও গভীর হয়েছে, যা তেলের দামের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইতিহাস বলে, ১৯৭৯ সালের ইরানী বিপ্লব বা ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো ঘটনায় তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। এবারও সেই আশঙ্কা প্রবল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পেট্রোল, ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন এবং খাদ্যপণ্যের খরচও বাড়বে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে তেল আমদানির উপর অর্থনীতি নির্ভরশীল। সরকারগুলোকে স্টকপাইলিং এবং বিকল্প শক্তি উৎসের দিকে নজর দিতে হবে।


