যে চাঁদে অ্যাপোলো মিশন কেবল পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছিল, সেখানে এবার বসতি গড়ার ডাক দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। শুধু নভোচারী পাঠানো নয়, সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ ও মহাকাশের গভীরে অভিযানের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাপরিকল্পনা সম্প্রতি ‘ইগনিশন’ অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই উদ্যোগে নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, এখন প্রতিযোগিতা ‘বছরের’ নয়, ‘মাসের’ হিসাবে গণনা করা হবে।
‘অসম্ভবকে সম্ভব’-এর নতুন সংজ্ঞা
নাসার নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান, যিনি নিজেও বেসরকারি মহাকাশ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর প্রথম বার্তায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন সময়ের মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নাসা আবারও প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাঁদে ফেরা, সেখানে একটি ঘাঁটি তৈরিসহ মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
এই ঘোষণা কেবল একটি মিশনের সময়সীমা নির্ধারণ নয়; এটি পুরো কৌশলগত দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। নাসা এখন ‘বারবার যাওয়া’র প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায়। এর অর্থ, চাঁদে যাওয়া আর কোনো বিরল ঘটনা থাকছে না। বরং, পৃথিবীর কোনো প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে নিয়মিত ফ্লাইটের মতো চাঁদেও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা এক সময়ের কল্পবিজ্ঞান হলেও আজ বাস্তবতার পথে।
আর্টেমিসের নতুন অধ্যায়: ছয় মাস অন্তর মিশন
এই পরিকল্পনার প্রথম মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’। ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনের মাধ্যমে আবারও মানবপা পড়বে চাঁদের মাটিতে। তবে সেখানেই থামছে না গল্প। তার পরবর্তী সময় থেকে ছয় মাস অন্তর নিয়মিত মিশন পাঠানোর রোডম্যাপ তৈরি করেছে নাসা। এই মিশনগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেগুলো হবে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের ধাপ।
‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’ নামে পরিচিত এই ঘাঁটিতে থাকবে আবাসিক ইউনিট, গবেষণাগার ও যানবাহন পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এই ঘাঁটি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, কারণ সেখানে সূর্যালোকের পাশাপাশি বরফাকৃতির পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা থেকে অক্সিজেন, পানি ও জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব।
নতুন প্রশাসকের বক্তব্যে ‘মাসের হিসাবে’ প্রতিযোগিতার যে উল্লেখ রয়েছে, তা কেবল সময়গত বিষয় নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। চীনও তাদের ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন’ (আইএলআরএস) তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে চাঁদের মাটিতে এখন কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, সেখানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়, তাদের মিত্র ও বেসরকারি অংশীদারদের নিয়ে গড়া এই কাঠামোই হবে চাঁদের প্রথম মানবিক বসতি।
নাসার এই পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (এইচএলএস) তৈরিতে প্রতিযোগিতা করছে। নাসা আর নিজে একা সব কিছু তৈরি করছে না; বরং তারা প্রযুক্তি কিনছে এবং বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে ‘পরিবহন ব্যবসায়ী’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই পদ্ধতি মিশনের ব্যয় কমিয়ে আনার পাশাপাশি গতি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এই চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণের লক্ষ্য শেষ কথা নয়। নাসা স্পষ্ট করে বলেছে, চাঁদ হবে মঙ্গল ও তার বাইরের মহাকাশে মানব অভিযানের ‘প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড’ বা প্রস্তুতির মঞ্চ। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ও রেডিয়েশন পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেই মানবজাতি পরবর্তী লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহের দিকে পা বাড়াবে।


