আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে নেপালের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা হয়েছে। ‘বালেন’ নামে পরিচিত র্যাপার ও প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহ দেশের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত বছর জেন-জেডের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এই শপথগ্রহণ হলো। শপথের আগের রাতে প্রকাশ করা এক র্যাপ গানে তিনি ‘অবিভক্ত নেপালি’ হয়ে ইতিহাস গড়ার আহ্বান জানান, যা কয়েক ঘণ্টায় ২০ লাখের বেশি দর্শক দেখেছে ।
শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, একজন কাঠামো প্রকৌশলী এবং জনপ্রিয় র্যাপার। ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থান পেয়েছেন এবং তিনিই প্রথম মধেশি অঞ্চল থেকে দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে আসীন হলেন ।
শপথ নেওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে গান প্রকাশ করে তিনি দেখিয়ে দিলেন, জনতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যম এখনও মঞ্চ ও মাইক। ‘জয় মহাকালী’ শিরোনামের এই গানে তিনি গেয়েছেন, ‘আমার হৃদয় সাহসে ভরা, লাল রক্ত ফুঁড়ে উঠছে; আমার ভাইয়েরা আমার পাশে, এবার আমরা জেগে উঠবো।’ প্রচারণার ভিডিওতে ঘেরা এই গানের একটি লাইন যেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে চিহ্নিত করে: ‘আমার নিঃশেষ হোক না শ্বাস, আমি চিতাবাঘের গতিতে দৌড়াবো’ ।
প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল নেপালের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য উদাহরণ। রাষ্ট্রপতি ভবন ‘শীতল নিওয়াস’-এ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাতটি শঙ্খের ধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। ১০৮ জন হিন্দু ‘বটুক’ (যুব ব্রাহ্মণ) বেদ মন্ত্র পাঠ করেন এবং ১০৭ জন বৌদ্ধ লামা ‘মঙ্গল বচন’ পাঠ করেন। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাউডেল সংবিধানের ৭৬(১) ধারার অধীনে তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান ।
শপথগ্রহণে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’, মাধব কুমার নেপালসহ অনেকে। তবে চারবারের প্রধানমন্ত্রী ও ঝাপা-৫ আসনে বালেন্দ্র শাহর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত কে পি শর্মা অলির অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। জি-৫ আসনে বালেন পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট, যেখানে অলি পেয়েছেন মাত্র ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট ।
‘জেন-জেডের আদেশ’ এবং চ্যালেঞ্জের মেয়াদ
বালেনের এই অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ নির্বাচনী জয় নয়। এটি ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ গণআন্দোলনের ফলাফল। সে সময় সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারান। সেই আন্দোলনের মাধ্যমেই কার্যত উৎখাত হন কে পি শর্মা অলি। সেই শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সুষিলা কার্কি বিদায়বেলায় বলেছেন, ‘জনগণ জেন-জেড আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছেন’ ।
কার্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, তরুণ নেতৃত্বে নতুন সরকার দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের মধ্যেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে বালেনকে সামনে নিয়ে আসা সেই আন্দোলনের তদন্ত প্রতিবেদন এখন তাঁর সামনেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৬৩ জনের মধ্যে ৪৮ জনের বুক ও মাথায় গুলি লেগেছে ।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই বালেন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রতিরক্ষা ও শিল্প মন্ত্রক নিজের কাছে রেখে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন স্বর্ণিম ওয়াগ্লেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সুধান গুরুং, আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আছেন শিশির খানাল ।


