TT Ads

জিভের ডগায় আগুন, চোখেমুখে পানি—অথচ বারবার বাড়িয়ে নেওয়া সেই ঝালের কামড়। শুধু স্বাদের নেশা না, যাঁরা ঝাল খেতে ভালোবাসেন, তাঁদের এই অভ্যাস আসলে এক ধরনের ‘দুঃসাহসিক অভিযান’। সাম্প্রতিক নিউরোসায়েন্টিফিক গবেষণা বলছে, এই ঝালপ্রীতি শুধু রসনাবিলাস নয়, এর ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিত্ব, মনস্তত্ত্ব আর দেহের এক জটিল রাসায়নিক সমীকরণ। আজকের প্রতিবেদনে জানব, কেন পৃথিবীর এক বড় অংশের মানুষ স্বেচ্ছায় এই ‘যন্ত্রণা’ বরণ করে নেন এবং এই অভ্যাস তাদের ব্যক্তিত্বের কোন দিকটির ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালা নয়, উৎকণ্ঠার মোড়ক

ঝাল খাওয়া মানেই মূলত ক্যাপসাইসিন নামক একটি যৌগের সঙ্গে লড়াই করা। মরিচের এই উপাদানটি আমাদের জিভের TRPV1 রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে—যে রিসেপ্টর সাধারণত ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা শনাক্ত করে। অর্থাৎ, মরিচ খেলে মস্তিষ্ক ভুল বুঝে মনে করে, মুখের ভেতর আগুন জ্বলছে।

কিন্তু যাঁরা এই অনুভূতি পছন্দ করেন, তাঁরা ঠিক কী পান? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যক্তিরা এক ধরনের ‘বিবিধ সংবেদনশীলতা’ (Sensation Seeking) নিয়ে থাকেন। তাঁরা জানেন এটা জ্বালা, কিন্তু এই জ্বালা কাটিয়ে ওঠার পর মস্তিষ্ক যে ‘এন্ডরফিন’ নিঃসরণ করে, তা আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক মাদক। ঝাল খাওয়ার পর যে হালকা উৎকণ্ঠা আর তার পরের স্বস্তি আসে, তা অনেকটা রোলার কোস্টারে চড়ার মতো—ভয় আর রোমাঞ্চের এক বিমূর্ত মিশ্রণ।

বৈজ্ঞানিক কারণ: কেন বারবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা?

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ঝাল খান, তাঁদের শরীর ধীরে ধীরে ক্যাপসাইসিনের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে। তবে এর বাইরেও এই ঝালপ্রীতি জিনগতভাবে নির্ধারিত হতে পারে। ‘ডেইলি মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাঁদের মধ্যে ‘ডোপামিন’ রিসেপ্টরের তারতম্য বেশি, তাঁরা সাধারণত ঝাল খেতে বেশি পছন্দ করেন। ডোপামিন আমাদের আনন্দের অনুভূতি জাগায়। যখন কেউ ঝাল খান, মস্তিষ্ক ভাবে তাঁকে ‘বিপদ’ থেকে বাঁচাতে এন্ডোরফিন ছাড়ে, আর এন্ডোরফিন ডোপামিনের উৎপাদন বাড়ায়। অর্থাৎ, ঝাল খাওয়া আসলে একটা রাসায়নিক পুরস্কার।

এছাড়াও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঝাল খাওয়ার সঙ্গে ‘টেস্টোস্টেরন’ হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষদের মধ্যে ঝালপ্রিয়তা বেশি দেখা গেলেও, বর্তমানে নারীদের মধ্যেও এর প্রবণতা বাড়ছে। এটি শুধু ‘পুরুষসুলভ’ চ্যালেঞ্জ না, বরং আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও সহনশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঝালপ্রিয় মানুষ: ব্যক্তিত্বের কয়েকটি রেখাচিত্র

সামাজিক আচরণ বিশ্লেষকদের মতে, যাঁরা খাবারে অতিরিক্ত ঝাল দিতে পছন্দ করেন, তাঁরা সাধারণত:

  • সাহসিক ও ঝুঁকিপ্রবণ: নতুন কিছু চেষ্টা করতে তাঁরা কখনো পিছপা হন না। শুধু খাবার নয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁরা বাঁধা ভাঙতে পছন্দ করেন।

  • সহনশীলতা বেশি: ঝাল খাওয়ার মধ্যে রয়েছে ধৈর্যের পরীক্ষা। যাঁরা এটি সহজে নেন, তাঁরা জীবনের জটিল পরিস্থিতিও তুলনামূলক শান্তভাবে মোকাবিলা করেন।

  • সামাজিকভাবে সক্রিয়: ঝাল খাওয়া প্রায়ই সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ। ‘চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়া, প্রতিযোগিতা করা—এসব তাঁদের জন্য বন্ধনের সেতু।

গরমের দেশে ঝালের রাজনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ঝাল খাওয়া শুধু ব্যক্তিত্বের বিষয় নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঝাল খাওয়ার একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। ঝাল শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ঘাম বাড়ায়, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আর্দ্র আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া নাশক হিসেবে মরিচের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ফলে, যাঁরা এখানে ঝাল খান, তাঁরা হয়তো অজান্তেই স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ঐতিহ্যের ধারক।

ঝালের নেশা কি ঠিক?

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতি ঝাল খাবার যেমন ‘ক্যারোলিনা রিপার’ বা ‘ঘোস্ট পেপার’-এর মতো চরম মাত্রার ঝাল খেলে পাকস্থলীর ক্ষতি হতে পারে। তবে পরিমিত মাত্রায় ঝাল খাওয়া বিপাকক্রিয়া বাড়ায়, ওজন কমায় এবং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *