ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশের সংবিধান অনুসরণ করে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিল নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবে, যাতে ৬৭ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।
খামেনির মৃত্যু ইরানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গত ৩৭ বছর ধরে দেশের ধর্মীয়, সামরিক এবং রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ-কে নিয়ে গঠিত।
কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য এবং এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের দ্বারা নির্বাচিত। ১৯৫৯ সালে ইয়াজ্দ প্রদেশের মেয়বোদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণকারী আরাফি কোমের প্রখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং ইরানের সেমিনারিগুলোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরাফি শিয়া মতবাদ প্রচারে সক্রিয় এবং সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ধর্মীয় আদর্শ ছড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন। ২০১৯ সাল থেকে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি ইরানের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচনের দায়িত্ব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর উপর। এই ৮৮ সদস্যের সংস্থা শিয়া ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত, যারা প্রতি আট বছরে নির্বাচিত হয়। খামেনির মৃত্যুর পর এই অ্যাসেম্বলি দ্রুত একটি নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে এই প্রক্রিয়া গোপনীয় এবং ধর্মীয় যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপ্লবী আদর্শের উপর নির্ভর করে। অতীতে খোমেনির পর খামেনির নির্বাচনও এমনই দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়েছিল।
এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক। খামেনির নেতৃত্বে ইরান পরমাণু কর্মসূচি, হিজবুল্লাহ এবং হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁর মৃত্যু এবং চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাউন্সিলকে সামরিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিদেশনীতিতে বড় পরিবর্তন হবে না, তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সংগ্রাম দেখা দিতে পারে।
আরাফির ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিপ্লবী মতাদর্শের অনুসারী এবং খামেনির বিশ্বস্ত বলে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে কাউন্সিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে থাকায় এই কাউন্সিলের প্রথম পরীক্ষা হবে যুদ্ধ পরিচালনা।


