মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হচ্ছে না। এই অবিচল অবস্থান দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনে কৌতূহল জেগেছে। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন মোড় দিয়েছে।
এই ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময়ে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বেরিয়ে আসে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কৌশল গ্রহণ করে, যার মধ্যে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি বাধা এবং পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘বিপজ্জনক’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব, বিশেষ করে সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই, এই চাপকে ‘অন্যায়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাদের কর্মসূচিকে ‘শান্তিপূর্ণ’ দাবি করে চালিয়ে যাচ্ছেন।
শনিবার ফক্স নিউজের ‘মাই ভিউ উইথ লারা ট্রাম্প’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উইটকফ এই বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন। তিনি জানান, ট্রাম্প ‘হতাশ’ নন, কারণ তাঁর হাতে অনেক বিকল্প রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্টের মনে প্রশ্ন জাগছে—কেন ইরান এখনো নতি স্বীকার করেনি? উইটকফের ভাষায়, “এত চাপ, এত নৌ ও সামুদ্রিক শক্তি মোতায়েনের পরও তারা কেন আমাদের কাছে এসে বলেনি—‘আমরা অস্ত্র চাই না, তাই আমরা এই পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত’?” এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কৌশলের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে, যেখানে চাপের পাশাপাশি ইরানের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা চলছে।
ইরানের অবস্থানের পিছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিবিদ্যা। দেশটির অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, জাতীয় গৌরব এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে ইরানী নেতৃত্ব অটল। সম্প্রতি ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের মাত্রা বাড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধিকৃত ইউরেনিয়ামের মজুত চুক্তির সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ছে, যাতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কৌশলের ফলাফল মিশ্র। একদিকে ইরানের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে এটি ইরানকে চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। উইটকফের সাক্ষাৎকার এমন সময়ে এসেছে যখন পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে এবং ইরানী তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের কৌতূহল ইঙ্গিত দেয় যে, চাপের পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার দরজা খোলা রাখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের অবস্থান পরিবর্তন না হলে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।


