২৬ মার্চের প্রথম আলো ফোটার আগেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগ-শ্রদ্ধার এক নির্মল মিলনক্ষেত্র। ১৯৭১ সালের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে ভোর ৬টায় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফুলের সুগন্ধ আর নীরবতার ভাষায় জাতি আবারও জানালো, স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস রক্তে লেখা।
ভোরের শিশির ভেজা সাভারের আকাশ। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর স্মৃতিসৌধের নির্মল শুভ্রতা। ঠিক ভোর ৬টায় পবিত্র এই স্থানে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। কিছুক্ষণ পরই সেখানে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। তারা ফুল হাতে তুলে দেন শহীদদের প্রতি—যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ এই লাল-সবুজের পতাকা উড়ছে।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর উভয় নেতা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্মৃতিসৌধের চিরশান্ত পরিবেশে শুধু শোনা যাচ্ছিল সশস্ত্র বাহিনীর ‘লাস্ট পোস্ট’ সংকেত। পরে একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সেই দলের কাঁধে তখন দেশের অহংকার। রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে পৃথকভাবে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
অনুষ্ঠান শুরুর আগেই স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন হাজারো মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা—কাঁধে ব্যাজ, বুকে পদক। তাঁদের অনেকের চোখ তখন অতীতে, ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। ছোট-বড় সব বয়সের মানুষ ফুল হাতে এসেছেন তাঁদের অজানা সেই বীরদের প্রতি ভালোবাসা জানাতে। অনেকে হাতে তুলে নিয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা। শিশুরা তাঁদের বাবা-মায়ের হাত ধরে জানতে চাইছে, ‘ওই স্মৃতিসৌধে কারা আছেন?’ বাবা-মায়া গল্প করে বলছেন, ‘যাঁদের জন্য আমরা আজ স্বাধীন।’
জাতীয় স্মৃতিসৌধে এই শ্রদ্ধা নিবেদন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লাখ মায়ের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল এই স্বাধীনতা। প্রতিবছর ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর ভোরের সূর্য ওঠার আগেই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এখানে এসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আজকের আয়োজনও তারই ধারাবাহিকতা।
এদিন সকালের এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্মৃতিসৌধ এলাকায় ছিল ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ভোর থেকেই মোতায়েন ছিলেন। সাভারের আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাধারণ মানুষ স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে শুরু করেন। সকাল গড়াতে না গড়াতেই হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর কন্যা জাইমা রহমানও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আগামী প্রজন্মের কাছে এই আয়োজনের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


