শিশুর জন্মের পর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা বারবার মনে করিয়ে দেন চিকিৎসকরা। তবু ভয়, গুজব বা অবহেলার কারণে অনেক অভিভাবক দেরি করেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই ক্ষুদ্র টিকাই কীভাবে মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করে, আর সময়মতো না নিলে ঝুঁকি কতটা বাড়ে?
শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক বছরই তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়টাতে শরীর নিজে থেকে অনেক সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। ঠিক এখানেই টিকার ভূমিকা শুরু হয়। টিকা মূলত শরীরকে আগেভাগে “শত্রু” চিনতে শেখায়। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় অংশ শরীরে প্রবেশ করিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে তোলা হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি টিকা শরীরের ভেতরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে একই জীবাণুর আক্রমণ হলে দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে রোগটি হয় না, বা হলেও খুব হালকা মাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকে। এ কারণেই হাম, ডিপথেরিয়া, পোলিও, হেপাটাইটিস-বি’র মতো একসময় প্রাণঘাতী রোগগুলো এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
তবে এই সুরক্ষা পেতে হলে নির্ধারিত সময়সূচি মেনে টিকা নেওয়া অপরিহার্য। প্রতিটি টিকার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, যখন শিশুর শরীর সেটি গ্রহণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী থাকে। সময় পেরিয়ে গেলে সেই কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক অভিভাবক টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। হালকা জ্বর, ব্যথা বা অস্বস্তি টিকা নেওয়ার পর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তবে এগুলো সাময়িক এবং তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র সমস্যা। বিপরীতে, টিকা না নিলে যে রোগগুলো হতে পারে, সেগুলোর জটিলতা অনেক বেশি গুরুতর।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “হার্ড ইমিউনিটি” বা সামষ্টিক প্রতিরোধ। সমাজের অধিকাংশ মানুষ টিকা নিলে সংক্রমণের বিস্তার কমে যায়, ফলে যারা দুর্বল বা টিকা নিতে পারে না, তারাও পরোক্ষভাবে সুরক্ষা পায়। কিন্তু যদি অনেকেই টিকা না নেন, তাহলে সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
গ্রামাঞ্চল বা প্রান্তিক এলাকায় এখনও টিকা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন টিকা দিলে শিশুর অসুস্থতা বাড়ে, আবার কেউ ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে বিরত থাকেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সচেতনতার অভাবই এখানে প্রধান বাধা।
মূল তথ্য:
- টিকা শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে
- নির্ধারিত সময়সূচি মেনে টিকা নেওয়া সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে
- টিকার সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলেও তা ক্ষণস্থায়ী
- টিকা না নিলে মারাত্মক সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে
- সামষ্টিক প্রতিরোধ বজায় রাখতে অধিকাংশ মানুষের টিকা নেওয়া জরুরি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই এখন প্রাথমিক টিকার আওতায় আসছে। তবে শতভাগ সাফল্য পেতে হলে অভিভাবকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ অপরিহার্য।


