সরকার কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের বিরুদ্ধে নয়, বরং অপরাধীদের জামিন প্রদানের বিরোধী—এমন স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। রোববার (২৫ জানুয়ারি) সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে কৃষি বিষয়ক এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এই মন্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে যশোর কারাগারে বন্দি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির বিষয়, যা সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, যিনি সেনাবাহিনীর সাবেক কোয়ার্টারমাস্টার জেনারেল, দেশের আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই মন্তব্য এসেছে এমন সময়ে যখন সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, এবং তাঁদের জামিন প্রাপ্তির চেষ্টা চলছে। উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, সরকারের লক্ষ্য অপরাধ দমন, কোনো দলীয় পরিচয় নয়।
ব্রিফিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষি খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা। কিন্তু সাংবাদিকরা যশোরের ঘটনায় প্রশ্ন তোলায় কথোপকথন আইনশৃঙ্খলার দিকে মোড় নেয়। জুয়েল হাসান সাদ্দাম, যিনি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, বর্তমানে যশোর কারাগারে বন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলায় অভিযোগ রয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, অস্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী ও নয় মাসের শিশু সন্তানের মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তির দাবি উঠেছে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে শুধু কারাগারের গেটে মৃতদেহ দেখার সুযোগ দিয়েছে, পুরোপুরি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেকে এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিহিত করেছেন।
আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এ ঘটনাকে ‘দমনমূলক নীতির উদাহরণ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সাদ্দামকে ১১ মাস ধরে জেলে রাখা হয়েছে মিথ্যা মামলায়, এবং পরিবারের ট্রমার কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অভিযোগকে আরও জোরালো করে। তবে উপদেষ্টা চৌধুরী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—অপরাধী যেই হোক, জামিনের বিরুদ্ধে। তিনি কৃষি বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমি কৃষি ছাড়া অন্য কথা বলব না,’ কিন্তু সাংবাদিকদের জোরাজুরিতে মন্তব্য করেন।
এই মন্তব্যের পটভূমিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে। এরপর থেকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্ত অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে ৫৩ হাজারেরও বেশি অপরাধী ও দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি নির্বাচনী নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ বলে দাবি করা হয়। তবে সমালোচকরা বলছেন, এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়া পড়ছে।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি সরকারের নিরপেক্ষতা প্রমাণের চেষ্টা। তিনি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আইনশৃঙ্খলায় কঠোরতার জন্য পরিচিত। কিন্তু যশোরের ঘটনা মানবিক দিক থেকে প্রশ্ন তুলেছে। সাদ্দামের ক্ষেত্রে ‘ডাবল জেওপার্ডি’র নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে একই অপরাধে একাধিকবার মামলা হয়েছে। এটি বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।


