ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম প্রতি আউন্স ১০০ মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। রুপার এই আকাশছোঁয়া উত্থানের সমান্তরালে নিরাপদ বিনিয়োগের চিরচেনা আশ্রয় সোনার দামও এখন প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছুঁইছুঁই। নতুন বছরের শুরুতেই মূল্যবান ধাতুর এই নজিরবিহীন উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) নিউইয়র্ক ও লণ্ডনের স্পট মার্কেটে লেনদেন চলাকালীন রুপার দাম এক লাফে ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে প্রতি ট্রয় আউন্স রুপার মূল্য দাঁড়ায় ১০১ দশমিক ২২ ডলারে। গত এক বছরে রুপার দাম বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশের বেশি, যা পণ্য বাজারের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম উত্থান।
এদিকে, সোনার বাজারও রয়েছে টগবগে উত্তেজনায়। শুক্রবার লেনদেনের এক পর্যায়ে সোনার স্পট মূল্য আউন্স প্রতি ৪ হাজার ৯৬৮ ডলারে পৌঁছায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই এটি ৫ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক বাধা পার করে ফেলবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই দাম বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ।
১. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: গ্রিনল্যান্ড ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি বিনিয়োগকারীদের বিচলিত করে তুলেছে। ন্যাটোর ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাপানে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা বাজারের অনিশ্চয়তাকে আরও উসকে দিয়েছে।
২. ডলারের দুর্বলতা ও সুদের হার: মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং সুদের হার কমার প্রত্যাশা ডলারের মানকে দুর্বল করেছে। মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির মুখে বিনিয়োগকারীরা নগদ অর্থ বা বন্ডের বদলে সোনা ও রুপার মতো ‘হার্ড অ্যাসেট’-এ বিনিয়োগ নিরাপদ মনে করছেন।
৩. রুপার শিল্প চাহিদা: কেবল বিনিয়োগ নয়, রুপার এই অভাবনীয় দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে এর ক্রমবর্ধমান শিল্প ব্যবহার। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) এবং উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্সে রুপার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় শিল্প মালিকরা আগেভাগেই মজুত বাড়াচ্ছেন।
বিনিয়োগ বিশ্লেষণী সংস্থাগুলোর মতে, এই ঊর্ধ্বগতি কেবল শুরু। গোল্ডম্যান স্যাকস ও জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালে সোনা ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বছরের প্রথম মাসেই সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাওয়াটা বিস্ময়কর।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মুদ্রাবাজারের ওপর আস্থা কমতে থাকায় মানুষ এখন বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে। রুপার সরবরাহ ঘাটতি আগামী দিনগুলোতেও বজায় থাকবে, যা দামকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে। তবে বাজারের এই তীব্র গতিতে যেকোনো সময় সাময়িক ‘প্রফিট টেকিং’ বা দরপতন হতে পারে বলে ছোট বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।


