TT Ads

শুধু কথায় নয়, পাতে সাজানো খাবারও যে মানসিক চাপের ওষুধ হতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। অফিসের প্রেশার, সংসারের দায়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—দৈনন্দিন জীবনে অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ এখন নগরজীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘পুষ্টিগত মনোবিজ্ঞান’ (Nutritional Psychology) নামের গবেষণার শাখাটি জানাচ্ছে, আপনার প্লেটে রাখা উপাদানগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের রসায়নকে বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ মনের ভার লাঘবের চাবি হয়তো লুকিয়ে আছে রান্নাঘরের আলমারিতে, ফার্মেসির শেলফে নয়।

মস্তিষ্ক আর পাকস্থলীর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

বহুকাল ধরে আমরা মনের সমস্যাকে শুধু ‘মাথার’ সমস্যা বলে আসছিলাম। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলী একটি সূক্ষ্ম সেতুবন্ধনে আবদ্ধ। ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ নামে পরিচিত এই সংযোগপথে স্নায়ু ও হরমোনের মাধ্যমে দুই অঙ্গ পরস্পরকে বার্তা পাঠায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের অন্ত্রেই উৎপন্ন হয় সেরোটোনিনের মতো ‘হ্যাপি হরমোন’। অন্যদিকে, ক্রমাগত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি বা অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট অন্ত্রের ‘গুড ব্যাকটেরিয়া’কে ধ্বংস করে দেয়, যা সরাসরি উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

ঢাকার একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুষ্টিবিদ নাজমা খানম বলেন, “আমরা যখন রোগীকে শুধু ওষুধ দিয়ে স্থিতিশীল করি, কিন্তু খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিই না, তখন পুরো নিরাময় হয় না। বিশেষ করে যাদের অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার ধরা পড়ে, তাদের ক্ষেত্রে খাবারই অনেক সময় মূল ট্রিগার বা শান্তির উৎস।”

কোন খাবারগুলো উদ্বেগ কমায়?

পুষ্টিগত মনোবিজ্ঞান বলছে, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য উপাদান মস্তিষ্কে ‘গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড’ (GABA) ও সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে মানসিক চাপ উপশম করে। নিচে তেমনই কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদানের তালিকা দেওয়া হলো যা সহজেই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় যোগ করা সম্ভব:

  • ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: মস্তিষ্কের প্রদাহ কমিয়ে অ্যাংজাইটি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইলিশ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ, চিয়া সিড ও আখরোটে এটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

  • ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: ‘রিলাক্সেশন মিনারেল’ নামে পরিচিত ম্যাগনেশিয়াম পেশি ও স্নায়ুকে শিথিল করে। কাঁচা কলা, কুমড়ার বীজ, পালং শাক ও ডার্ক চকলেট এই উপাদানের ভালো উৎস।

  • প্রোবায়োটিক ও ফার্মেন্টেড খাবার: দই, টক দই, ঘরে তৈরি আচার (গাজর, লেবু) অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রোবায়োটিক গ্রহণকারীদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।

  • জটিল শর্করা (Complex Carbs): ব্রাউন রাইস, ওটস, লাল আটা—এগুলো ধীরে ধীরে শর্করা রক্তে মিশিয়ে ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়, যা থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন। সাদা চাল বা চিনির মতো সরল শর্করা বরং মুড সুইং বাড়ায়।

যেসব খাবার বাড়ায় উদ্বেগ

শুধু ‘কী খাবেন’ তা জানা জরুরি, পাশাপাশি ‘কী এড়িয়ে চলবেন’ জানাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল অ্যাংজাইটি রোগীদের জন্য বিষের মতো কাজ করে। অতিরিক্ত কফি বা চা অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদস্পন্দন দ্রুত করে, যা উদ্বেগের লক্ষণকে আরও প্রকট করে তোলে। এছাড়া চিনিযুক্ত পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও ফাস্টফুড অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে।

খাদ্যাভ্যাস কেবল শুরু, শেষ নয়

পুষ্টিবিদ নাজমা খানম আরও জানান, “শুধু খাবার দিয়ে গুরুতর অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি সঠিক পুষ্টি একধরনের ‘সাপোর্ট থেরাপি’ হিসেবে কাজ করে।” তিনি পরামর্শ দেন, নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখা জরুরি।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *