ঈদ এলেই বাঙালি নারীর মনে জাগে নতুন শাড়ির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নের অন্যতম প্রধান ঠিকানা চটকদার কারুকাজ করা বেনারসি। রাজধানীর অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীবিধৌত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা ঘেঁষা ডেমরার পাইকারি বেনারসি হাট এখন যেন এক অন্য নগরী।
রাতের নিস্তব্ধতা ফুঁড়ে মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে এই পাইকারি হাট। ঈদের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন, তাই এই হাট এখন জমে উঠেছে ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায়, দরদাম আর তাঁতভাঙা পরিশ্রমের গল্পে।
সাধারণত সারা বছরই বেনারসির বেচাকেনা কম-বেশি চলে, তবে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার আগে চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে এই বাজারকে ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয় শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগর, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের জীবনেও।
প্রকৃতি যখন প্রচণ্ড তাপমাত্রায় হাঁসফাঁস করছে, তখন তাঁতের লুঙ্গিতে বোনা হচ্ছে ঈদের সম্ভার। দিনের বেলা তাঁতের কাজ, আর মধ্যরাতে বাজার—দম ফেলার সময় নেই তাঁতিদের। এই ব্যস্ততাই যেন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় আরাম, কারণ ঈদ এলেই তাঁত ফেরে।
রূপগঞ্জের ডেমরা এলাকায় অবস্থিত এই পাইকারি বেনারসি হাটটি উপমহাদেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট-বড় পাইকারি ক্রেতারা ভিড় জমান। আবার এই বাজার থেকেই বেনারসি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের খুচরা বিপণিবিতানে। রোববার দিবাগত রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, মাত্র ১০-১২ ফুট চওড়া একটি সরু গলির দুপাশে সারি সারি দোকান। প্রতিটি দোকানের সামনে ঝোলানো নানা ডিজাইনের বেনারসি, আর ক্রেতারা টর্চের আলোয় গুণাগুণ যাচাই করে নিচ্ছেন।
একাধিক বিক্রেতা জানান, তাঁতিরা দিনরাত পরিশ্রম করে শাড়ি তৈরি করেন। সেই শাড়ি নিয়ে আসেন এই পাইকারি হাটে। এখান থেকে সারা দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান। প্রতিটি শাড়ির পাইকারি দর শুরু হয়েছে দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত, তবে মান ও কারুকাজ ভেদে এর বেশি দামেও কেনাবেচা হয়।
বিক্রেতা জামাল মিয়া জানান, “এখন তো প্রচণ্ড গরম, তবুও ঈদের অর্ডার মেটাতে তাঁতে লেগে থাকতে হয়। সারাদিন কাজ করে রাতে এনে বসি বাজারে। ঈদ এলে একটু দামও ভালো পাওয়া যায়, তাই এই গরমও লাগে না।”
পাশের দোকানের মালিক হাজি আবুল কালাম বলেন, “এই বাজারটা মূলত পাইকারি, এখানে প্রযোজক থেকে সরাসরি কিনতে পারেন ক্রেতারা। দামও খুচরা বাজারের তুলনায় অনেক কম। তাই ঈদের আগে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়ে।”
বেনারসি শাড়ির এই পাইকারি বাজারের ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। এক সময় শীতলক্ষ্যা নদীপথে বেনারসি আসত, এখন সড়কপথে সরবরাহ বেড়েছে। তবে পাইকারি হাটের জায়গাটি এখনও সেই পুরোনো আমেজ ধরে রেখেছে। এখানে মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া হাট ভোররাত পর্যন্ত চলে।
ক্রেতা ও বিক্রেতাদের আলাদা করে কোনো প্যান্ডেল বা আলোর ব্যবস্থা নেই। দোকানের সামনের সরু গলিতেই দাঁড়িয়ে চলছে কেনাবেচা। টর্চের আলোতেই দেখা হচ্ছে শাড়ির ডিজাইন। ভোররাতে বাজার শেষে সবাই ফিরে যায় নিজ নিজ গন্তব্যে।
ক্রেতা মনির হোসেন বলেন, “ঈদ উপলক্ষে স্ত্রীর জন্য কয়েকটা বেনারসি কিনতে এসেছি। ঢাকার খুচরা বাজারে দাম অনেক বেশি, এখানে পাইকারি দরে কিনতে পারছি, তাই ভালো।” আরেক ক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমি মুন্সিগঞ্জ থেকে এসেছি। প্রতিবার ঈদের আগে এখান থেকে বেনারসি কিনে নিয়ে যাই। এখানে বৈচিত্র্য অনেক বেশি, তাই পছন্দের শাড়ি পাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।”


