TT Ads

রমজানের এক মাসের রোজা, তারপর ঈদের উৎসব, আর তার পরই বিনা প্রস্তুতিতে কর্মব্যস্তায় ফিরে যাওয়া। বছরের এই মাত্র ৪০ দিনের ব্যবধানে আমাদের শরীর অভ্যন্তরীণ ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম) বারবার বড় ধরনের টানাটানির মুখে পড়ে। খাওয়া-ঘুম থেকে শুরু করে হরমোনের নিঃসরণ—সব কিছুতে এই সময় আসে চরম অস্থিরতা।

আর এই অস্থিরতাকেই আমরা ভুল করে সাধারণ ক্লান্তি বলে উড়িয়ে দিই। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কয়েকটি লক্ষণ কিন্তু ইঙ্গিত দেয় যে শরীর ভেঙে পড়ার পথে। জেনে নিন কোন উপসর্গগুলোকে হালকাভাবে না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শরীরের ঘড়িতে কেন পড়ে ধাক্কা?

ঈদ-উল-ফিতর মানেই খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান শেষে হুট করে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে যাওয়া। রমজানে সেহরি ও ইফতারের কারণে শরীর ঘুমের ধরণ, খাদ্য গ্রহণের সময় ও পরিমাণ, এমনকি পানি পানির চক্রে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ঈদের সময় মধ্যরাত পর্যন্ত জাগা, দিনের বেলা বিশ্রাম—এই অভ্যাসগুলো আবার দৈনন্দিন চাকরি বা ব্যবসার কঠোর সময়সূচির সঙ্গে সংগতি রাখে না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, হঠাৎ করেই যখন খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের সময় ও শারীরিক কর্মক্ষমতার মান তিনটি ধাপেই আমূল পরিবর্তন ঘটে, তখন শরীরের ‘অ্যাডাপ্টেশন’ মেকানিজম ব্যাহত হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. ফারজানা হক জানান, “এই সময়কালে রোগীরা প্রায়ই বলেন ‘শরীরে কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই’, ‘মাথা ঘুরায়’, ‘ঘুম ভাঙার পরও ক্লান্তি লাগে’। কিন্তু অনেকে এগুলোকে অবহেলা করেন, যা পরে বড় অসুস্থতার আকার নেয়।”

৪০ দিনের মধ্যে যে ৫ লক্ষণে সতর্ক হবেন আপনি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা, ঈদ ও স্বাভাবিক জীবনের এই সন্ধিক্ষণে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে তা শুধু ক্লান্তি নয়, বরং শরীরের ‘মালঅ্যাডাপ্টেশন’ বা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ:

  • অবিরাম মাথাব্যথা ও মস্তিষ্কের কুয়াশা (Brain Fog): হঠাৎ ক্যাফেইন বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ঘুমের প্যাটার্ন বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে রক্তনালির প্রসারণ-সংকোচনে সমস্যা হয়। মাইগ্রেন বা টেনশন headaches বেড়ে যায়। সঙ্গে কাজে মন বসাতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া—এগুলো ব্রেন ফগের ইঙ্গিত।

  • গ্যাস্ট্রিকের জটিলতা: রমজানে দীর্ঘক্ষণ খালি পেট থাকার পর ইফতার ও রাতের খাবারে ভাজাপোড়া খাওয়া। ঈদের পর আবার অফিসের তাড়াহুড়োয় অনিয়মিত খাবার। ফলে অম্বল, বুকজ্বালা, পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা প্রকট হয়। অনেক সময় একে সাধারণ বদহজম ভেবে অ্যান্টাসিড খেয়ে চললেও অন্ত্রের ভেতরের ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

  • অনিদ্রা ও অতিরিক্ত ঘুমের দোলাচল: রমজানের শেষ সপ্তাহে ইবাদতের জন্য রাত জাগা এবং ঈদের রাতে দীর্ঘক্ষণ জাগার পর যখন ভোরবেলা অফিসের জন্য উঠতে হয়, তখন ঘুমের চক্র সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে যায়। ফলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায়, কিন্তু রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম আসে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগেরও কারণ হতে পারে।

  • হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসের ধাক্কা: রোজায় অনেকে ওজন কমালেও ঈদের পর অল্প কয়েকদিনেই অনিয়ন্ত্রিত খাবার ও স্ট্রেস কর্টিসোল হরমোন বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শরীরের মেটাবলিজম (বিপাকক্রিয়া) অস্থির হয়ে যায়। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য এই সময়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

  • পেশির দুর্বলতা ও হৃদস্পন্দনের তারতম্য: রুটিন পরিবর্তনের সঙ্গে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি যদি থেকে যায়, তাহলে পেশিতে টান ধরা, পা ব্যথা করা এবং মাঝে মাঝে ধড়ফড় করা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় রোগী মনে করেন এটা শুধু ক্লান্তি, অথচ এটি ডিহাইড্রেশন বা পটাশিয়ামের অভাবের মারাত্মক সংকেত।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ‘ডিটক্স’ নয়, ‘রুটিন রিসেট’ জরুরি

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়টায় শরীরকে জোর করে কোনো ‘ডিটক্স’ ডায়েট দেওয়া বা এক্সট্রিম ওয়ার্কআউটে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নয়। বরং ধীরে ধীরে রুটিন ‘রিসেট’ করা জরুরি। ঘুমের সময় প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে আগে বাড়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান, এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে সুষম খাদ্য তালিকায় ফিরে আসা—এগুলো ধৈর্যের সঙ্গে করতে হবে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *