ভার্চুয়াল জগৎ এখন আর শুধু খবর বা বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক মায়াবী আয়না, যেখানে কেউ নিজেকে দেখে, আর কেউ দেখায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই নিয়ন আলোর জগতে গ্ল্যামার আর কৃত্রিম সৌন্দর্যের আড়ালে নিজের আসল রূপ লুকিয়ে রাখা এখন প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু সম্প্রতি এক চীনা ইনফ্লুয়েন্সারের ক্ষেত্রে এই ‘ফিল্টার’ বিড়ম্বনা এমন এক নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে, যা সার্বক্ষণিক অনলাইনে থাকা অভ্যস্ত এক প্রজন্মকেও ভাবিয়ে তুলবে। প্রযুক্তির সাময়িক ত্রুটিতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ অনুসারী।
ঘটনাটি ঘটেছে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডুইন (টিকটকের চীনা সংস্করণ)-এর এক লাইভ স্ট্রিমিং সেশনে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী তার বসার ঘরে বেগুনি রঙের আরামদায়ক পোশাকে বসে গান গেয়ে অনুসারীদের বিনোদন দিচ্ছিলেন।
তার গায়ের রং ফর্সা, ত্বক ছিল পুতুলের মতো মসৃণ—যা আধুনিক বিউটি ফিল্টারের পরিচিত ছাপ। হঠাৎ করেই প্রযুক্তিগত এক গোলমালে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ব্যবহৃত ‘বিউটি ফিল্টার’টি সরে যায়। আর তখনই পর্দায় ধরা পড়ে সেই চিরচেনি, বাস্তব চেহারা।
মুহূর্তের মধ্যে রূপ বদলে যায়। ফিল্টার-নির্ভর প্লাস্টিক সৌন্দর্যের জায়গায় ফিরে আসে এক পরিণত ও স্বাভাবিক ত্বকের অধিকারী নারীর মুখ। যদিও কয়েক সেকেন্ড পরেই প্রযুক্তি আবার তার খেল দেখায় এবং ফিল্টার ফিরে আসে, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। সেই কয়েক সেকেন্ডের সেই বাস্তব চিত্র ধারণ করে ফেলেন দর্শকরা। সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে ডুইন ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে। খবর প্রকাশের আগেই এই ভিডিওটি দেখেছে কয়েক কোটি মানুষ।
ফিল্টার ফেরত এলেও, ভক্তদের বিশ্বাস আর আস্থা আর ফেরেনি। খবরে প্রকাশ, এই ঘটনার পর থেকেই একে একে গ্রুপ ছাড়তে থাকেন অনুসারীরা। হিসাব কষে দেখা গেছে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার অনুসারীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার, যা প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি। অনেকে এটিকে ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় ‘আনফলো’ অভিযান হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
সত্যের মুখোমুখি হয়ে নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া
অনুসারী কমলেও এই ঘটনায় একটি বড় অংশ নেটিজেন কিন্তু ওই নারীর প্রকৃত চেহারার পক্ষেই কথা বলেছেন। একজন লিখেছেন, “ওনার আসল চেহারা অনেক বেশি মানবিক এবং সুন্দর। ফিল্টার করা প্লাস্টিকের পুতুল দেখে যারা মুগ্ধ হয়েছিলেন, তারাই এখন হতাশ হয়েছেন।” আরেকজন প্রশ্ন তুলেছেন, “মানুষ কীভাবে এতদিন ওই কৃত্রিম, অবাস্তব চেহারাকে আসল বলে মেনে নিয়েছিল?”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা ডিজিটাল সৌন্দর্যের মিথ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একটি বড় আঘাত। শুধু চীনে নয়, সারা বিশ্বেই সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা ফিল্টারের মাধ্যমে নিজেদের একটি অবাস্তব রূপ তৈরি করেন, যা দেখে সাধারণ মানুষ হীনম্মন্যতায় ভোগেন। এই প্রতারণার পর্দা সরে গেলে যেমন অনুসারীরা হতাশ হন, তেমনি ইনফ্লুয়েন্সারের ভাবমূর্তিও চুরমার হয়ে যায়।


