মাত্র ৫ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি করেছেন বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক। অথচ রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারে সেই শিম কিনতে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ৭০ টাকা। মাত্র একদিনের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে ১৩ গুণ! কোথায়, কীভাবে এত দাম বাড়ে?
বৃহস্পতিবার সকালে বগুড়ার মহাস্থান হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত শীতকালীন সবজি নিয়ে হাজির হয়েছেন এই পাইকারি হাটে। এখানে দরদাম হয় লাফালাফি করে।
কৃষক জানান, তিনি কেজিপ্রতি ৫ টাকা দরে শিম বিক্রি করেছেন। অথচ উৎপাদন খরচই ছিল কেজিতে ৪ টাকার বেশি। ন্যায্যমূল্যের আশায় তিনি হাটে এলেও শেষ হাসি হাসেননি। উল্টো লোকসানের মুখে পড়েছেন অনেকেই।
হাট থেকে শুরু হয় চড়া দামের পথচলা। কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে নেন স্থানীয় ফড়িয়া বা আড়তদার। এরপরই শুরু হয় নামে-বেনামে টাকা আদায়ের পালা। হাটের ইজারাদার থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার কমিটির সদস্যরা প্রতিটি পণ্য বিক্রিতে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করেন। এক আড়তদার জানান, হাট থেকে পণ্য তোলার সময় মণপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা হাট কর দিতে হয়। তার ওপর আছে লেবার খরচ, প্যাকিং খরচ।
সন্ধ্যা নাগাদ শিম, বেগুন, কাঁচামরিচ বোঝাই করে একটি ট্রাক ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বগুড়া থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটারের এই পথ পাড়ি দিতে গাড়িটি সময় নেয় প্রায় ১০ ঘণ্টা। শুধু যানজটই নয়, পথে পথে থামতে হয়েছে চাঁদাবাজদের কারণে।
ট্রাকচালক জানান, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর হয়ে ঢাকা ঢোকার মুখে কয়েকটি পয়েন্টে স্থানীয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা দিতে হয়েছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় তো বটেই, ঢাকার চৌরাস্তা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায়ও গাড়ি থামিয়ে ‘পারমিট ফি’, ‘ডেভেলপমেন্ট চার্জ’ বাবদ হাজার হাজার টাকা আদায় করা হয়।
ট্রাকচালক আব্দুল কাদের বলেন, “বগুড়া থেকে ঢাকা আসতে গাড়ির তেল-গ্যাস খরচ ছাড়াও পথে বিভিন্ন জায়গায় মাফিয়াদের ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দিতে হয়। এই টাকা না দিলে গাড়ি এগোতে দেয় না। শেষ পর্যন্ত এই খরচ তো পণ্যের ওপর চাপাতেই হয়।”
শুক্রবার ভোরে ট্রাক থেকে পণ্য নামে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর একটি আড়তে। এখানেই মূলত পাইকারি ক্রেতারা এসে পণ্য কিনে নেন। আড়তদার জানালেন, তারও খরচ আছে। আড়ত ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা খরচ—সব মিলিয়ে পণ্যের ওপর বাড়তি কিছু টাকা ধার্য করতে হয়। এই আড়ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্য কিনে নিয়ে যান বিভিন্ন খুচরা বাজারে।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেল, সেই শিমের কেজি ৭০ টাকা। কাঁচামরিচ ১২০ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদেরও তো দোকানভাড়া, পরিবহন খরচ, বর্জ্য ফেলার খরচ মেটাতে হয়। ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, এভাবেই কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে অন্তত ১০ থেকে ১২টি হাতবদল হয় পণ্যের। প্রতিটি ধাপে যোগ হয় নতুন নতুন খরচ, যার পুরোটাই শেষ পর্যন্ত বহন করেন সাধারণ ক্রেতা।


