সংবিধান সংস্কারে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও জনপ্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ শনিবার রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কেই সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সারদায় কঠোর বার্তা
রাজশাহীর বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি (বিপিএ) মাঠে ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ ছিল আজকের মূল আয়োজন। প্রশিক্ষণ শেষে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া নতুন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর ভাষণে পেশাদারিত্ব ও জনবান্ধব সেবার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তবে ভাষণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেই তিনি তুলে ধরেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান সংস্কার নিয়ে অবস্থান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের যে চেতনা, যে আত্মত্যাগ—সেটা যেন সংবিধানে প্রতিফলিত হয়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, সংস্কার প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনৈতিক দল নয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ভিত্তি হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’, যাতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর রয়েছে।
‘জুলাই সনদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়, তারই প্রতিফলন এই সনদ। গত ২৪ জানুয়ারি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এতে স্বাক্ষর করেন। সনদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের মন্তব্য সেই সনদকে সরকারিভাবে সংস্কার প্রক্রিয়ার ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে গ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ সংবিধান সংস্কার নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছিল। কেউ কেউ সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দিচ্ছিলেন, আবার কেউ কেউ আমূল পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছিলেন। আজকের ঘোষণার মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গেই সংস্কারের গতিপথ নির্ধারিত হবে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সতর্কতা
নতুন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে আপনাদের ভূমিকা হবে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব। জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলেই আমরা একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।” তিনি পুলিশ সদস্যদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত, ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচে ১৫০ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলেন।
শহীদ পরিবার ও জনপ্রত্যাশা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিশেষভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বলেন, “যেসব তরুণ-তরুণী দেশের জন্য নিজেদের জীবন দিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা এখন আমাদের দায়িত্ব। সংবিধান সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমরা সেটাই করার চেষ্টা করবো।”
এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে একটি খসড়া প্রস্তুত করা হবে। সেই খসড়া নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি ‘জুলাই সনদের ভিত্তিতে সমঝোতার মধ্য দিয়ে’ সম্পন্ন হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।


