গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ কমার নাম নিচ্ছে না। ইয়েমেনের হুতিরা ইসরায়েলের ওপর হামলা জোরদার করেছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে লোহিত সাগরে আবারও বাণিজ্য জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। যদি হুতিরা সেই পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হুতিদের নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে ইরানসমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। প্রথম দিকে এসব হামলা ছিল বিক্ষিপ্ত। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আইরন ডোম’ অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়। ফলে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একটি হুতি ড্রোন সরাসরি তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। ঘটনায় এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এটি ছিল হুতিদের সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও হুতিদের হামলা বেড়েছে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ইলাতে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা।
সামরিক হুমকি বনাম বাণিজ্যিক হুমকি
ইসরায়েলের জন্য হুতিদের এই হামলা সামরিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের বড় অংশ। ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো সীমিত। কিন্তু প্রকৃত উদ্বেগের কারণ হচ্ছে লোহিত সাগর। এই পথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর ও এশিয়াকে সংযুক্ত করা এই পথটি ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে হুতিরা বিশ্ব বাণিজ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। বহু জাহাজকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ পথে ঘুরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। পণ্য পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয় চরম সংকট। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু এখন আবার সেই আশঙ্কা ফিরে এসেছে।
বাণিজ্যের শিরা ছিন্ন হলে যা হবে
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রতিমাসে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। পণ্যের দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ইতোমধ্যেই হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু সেই অভিযান হুতিদের পুরোপুরি দমাতে পারেনি। বরং আঞ্চলিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হুতিরা কেন তাদের হামলা বন্ধ করছে না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন কূটনীতিকরা। ইরানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হুতিদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়েছে। হুতিরা জানিয়ে দিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ‘অবিচার’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে।


