গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ কমার নাম নিচ্ছে না। ইয়েমেনের হুতিরা ইসরায়েলের ওপর হামলা জোরদার করেছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে লোহিত সাগরে আবারও বাণিজ্য জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। যদি হুতিরা সেই পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনী রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হুতিদের নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়া

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে ইরানসমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। প্রথম দিকে এসব হামলা ছিল বিক্ষিপ্ত। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আইরন ডোম’ অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝপথে ধ্বংস করে দেয়। ফলে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একটি হুতি ড্রোন সরাসরি তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। ঘটনায় এক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এটি ছিল হুতিদের সক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও হুতিদের হামলা বেড়েছে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ইলাতে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তারা।

সামরিক হুমকি বনাম বাণিজ্যিক হুমকি

ইসরায়েলের জন্য হুতিদের এই হামলা সামরিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের বড় অংশ। ইসরায়েলের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো সীমিত। কিন্তু প্রকৃত উদ্বেগের কারণ হচ্ছে লোহিত সাগর। এই পথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। সুয়েজ খালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর ও এশিয়াকে সংযুক্ত করা এই পথটি ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে হুতিরা বিশ্ব বাণিজ্যে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছিল। বহু জাহাজকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ পথে ঘুরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। পণ্য পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হয় চরম সংকট। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু এখন আবার সেই আশঙ্কা ফিরে এসেছে।

বাণিজ্যের শিরা ছিন্ন হলে যা হবে

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যে প্রতিমাসে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও এটি বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। পণ্যের দাম বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ইতোমধ্যেই হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু সেই অভিযান হুতিদের পুরোপুরি দমাতে পারেনি। বরং আঞ্চলিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হুতিরা কেন তাদের হামলা বন্ধ করছে না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন কূটনীতিকরা। ইরানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হুতিদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়েছে। হুতিরা জানিয়ে দিয়েছে, গাজায় যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ‘অবিচার’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে।

সংবিধান সংস্কারে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও জনপ্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

আজ শনিবার রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কেই সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

সারদায় কঠোর বার্তা

রাজশাহীর বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি (বিপিএ) মাঠে ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ ছিল আজকের মূল আয়োজন। প্রশিক্ষণ শেষে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া নতুন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর ভাষণে পেশাদারিত্ব ও জনবান্ধব সেবার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তবে ভাষণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেই তিনি তুলে ধরেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান সংস্কার নিয়ে অবস্থান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের যে চেতনা, যে আত্মত্যাগ—সেটা যেন সংবিধানে প্রতিফলিত হয়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, সংস্কার প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনৈতিক দল নয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ভিত্তি হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’, যাতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর রয়েছে।

‘জুলাই সনদ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়, তারই প্রতিফলন এই সনদ। গত ২৪ জানুয়ারি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এতে স্বাক্ষর করেন। সনদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের মন্তব্য সেই সনদকে সরকারিভাবে সংস্কার প্রক্রিয়ার ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে গ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ সংবিধান সংস্কার নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছিল। কেউ কেউ সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দিচ্ছিলেন, আবার কেউ কেউ আমূল পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছিলেন। আজকের ঘোষণার মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করে দিল যে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গেই সংস্কারের গতিপথ নির্ধারিত হবে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সতর্কতা

নতুন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে আপনাদের ভূমিকা হবে নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব। জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলেই আমরা একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো।” তিনি পুলিশ সদস্যদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। প্রসঙ্গত, ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচে ১৫০ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিলেন।

শহীদ পরিবার ও জনপ্রত্যাশা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিশেষভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বলেন, “যেসব তরুণ-তরুণী দেশের জন্য নিজেদের জীবন দিয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা এখন আমাদের দায়িত্ব। সংবিধান সংস্কারের মধ্য দিয়ে আমরা সেটাই করার চেষ্টা করবো।”

এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে একটি খসড়া প্রস্তুত করা হবে। সেই খসড়া নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি ‘জুলাই সনদের ভিত্তিতে সমঝোতার মধ্য দিয়ে’ সম্পন্ন হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ২৮ দিনের মাথায় ফেটেছে জোটের ভিতরকার টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে চরম উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। ‘রাজ পরিবর্তন’ নিয়ে নেতানিয়াহুর ‘অতিরিক্ত আশাবাদী’ অবস্থানকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেন ভ্যান্স, যা দুই মিত্রশিবিরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে ।

কেন ‘গরম’ হলো ফোনালাপ?

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার (২৩ মার্চ) সংঘটিত এই ফোনালাপটিকে ‘টেনশনে ভরা’ ও ‘কঠিন’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সূত্রের খবর, ভ্যান্স সরাসরি নেতানিয়াহুকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পূর্বাভাস ‘অতিমাত্রায় আশাবাদী’ ছিল। বিশেষ করে ইরানে সরকার পতন কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা বাস্তবের তুলনায় অনেকটাই বাড়িয়ে বলা হয়েছিল ।

এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, “যুদ্ধের আগে ‘বিবি’ (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) সেটাকে প্রেসিডেন্টের কাছে খুব সহজ বলে সেল করেছিলেন। রাজ পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি বলে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর (নেতানিয়াহু) ওই সব বক্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ও বাস্তববাদী ছিলেন” ।

যুদ্ধের গতি আর ‘বাস্তব’ মূল্যায়ন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ বিমান অভিযান শুরুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত তেহরানে প্রত্যাশিত সরকার পতন ঘটেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এখনো টিকে আছে। এই বাস্তবতাই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। ভ্যান্স, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুদ্ধে ‘মিশন ক্রিপ’ বা লক্ষ্যবিচ্যুতির বিষয়ে সতর্ক থাকার পক্ষে সোচ্চার, তিনি নেতানিয়াহুকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান ।

উল্লেখ্য, ইরাক যুদ্ধের ভেটেরান ভ্যান্স শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত স্থল অভিযানের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি প্রশাসনের মধ্যে অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে শুধু যুদ্ধের সময়সীমা নয়, মার্কিন গোলাবারুদের মজুতের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ।

উপায়ন শেষে ‘অপারেশন’ বনাম ‘কূটনীতি’

এই উত্তপ্ত ফোনালালপের পরের ঘটনা আরও জটিল। ফোনালাপের পরের দিনই ইসরায়েলের একটি ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায় যে, পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার বিষয়ে নেতানিয়াহুকে ‘চিৎকার করে’ ধমক দিয়েছেন ভ্যান্স। যদিও ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম উভয় পক্ষই এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় ।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এটি নেতানিয়াহুর কাছের কেউ ‘অপারেশন’ হিসেবে ছড়িয়ে দিতে পারেন, যাতে ভ্যান্সের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, “এটি জেডির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের একটি অপারেশন” । মার্কিন গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ভ্যান্সের ক্রমবর্ধমান ভূমিকায় খুশি নয় তেল আবিব। ইরান যদি ভ্যান্সের সঙ্গেই আলোচনা করতে চায়, তাহলে সেটা ইসরায়েলের জন্য মোটেই আরামদায়ক নয়—এই ধারণা থেকেই এই ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইন’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।

আমেরিকা চায় ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’, ইসরায়েল চায় ‘চূড়ান্ত আঘাত’

এই মনোমালিন্যের গভীরে রয়েছে কৌশলগত লক্ষ্যের পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা ইরানে ভেনেজুয়েলার মডেলে সরকার পরিবর্তন চায়—অর্থাৎ সরকারের হাত বদল হবে, কিন্তু দেশ ধ্বংস হবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েল চায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার ‘স্থায়ী ও চূড়ান্ত’ ধ্বংস ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহুর একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন যেখানে ইরানের জনগণকে সরাসরি রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানানোর কথা ছিল। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেন, “জনগণকে রাস্তায় নেমে আত্মঘাতী হতে বলার কী দরকার?” ।

শুধু কথায় নয়, পাতে সাজানো খাবারও যে মানসিক চাপের ওষুধ হতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। অফিসের প্রেশার, সংসারের দায়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—দৈনন্দিন জীবনে অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ এখন নগরজীবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ‘পুষ্টিগত মনোবিজ্ঞান’ (Nutritional Psychology) নামের গবেষণার শাখাটি জানাচ্ছে, আপনার প্লেটে রাখা উপাদানগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের রসায়নকে বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ মনের ভার লাঘবের চাবি হয়তো লুকিয়ে আছে রান্নাঘরের আলমারিতে, ফার্মেসির শেলফে নয়।

মস্তিষ্ক আর পাকস্থলীর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

বহুকাল ধরে আমরা মনের সমস্যাকে শুধু ‘মাথার’ সমস্যা বলে আসছিলাম। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলী একটি সূক্ষ্ম সেতুবন্ধনে আবদ্ধ। ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ নামে পরিচিত এই সংযোগপথে স্নায়ু ও হরমোনের মাধ্যমে দুই অঙ্গ পরস্পরকে বার্তা পাঠায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের অন্ত্রেই উৎপন্ন হয় সেরোটোনিনের মতো ‘হ্যাপি হরমোন’। অন্যদিকে, ক্রমাগত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি বা অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট অন্ত্রের ‘গুড ব্যাকটেরিয়া’কে ধ্বংস করে দেয়, যা সরাসরি উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

ঢাকার একটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পুষ্টিবিদ নাজমা খানম বলেন, “আমরা যখন রোগীকে শুধু ওষুধ দিয়ে স্থিতিশীল করি, কিন্তু খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দিই না, তখন পুরো নিরাময় হয় না। বিশেষ করে যাদের অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার ধরা পড়ে, তাদের ক্ষেত্রে খাবারই অনেক সময় মূল ট্রিগার বা শান্তির উৎস।”

কোন খাবারগুলো উদ্বেগ কমায়?

পুষ্টিগত মনোবিজ্ঞান বলছে, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্য উপাদান মস্তিষ্কে ‘গামা-অ্যামিনোবিউটারিক অ্যাসিড’ (GABA) ও সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে মানসিক চাপ উপশম করে। নিচে তেমনই কয়েকটি প্রাকৃতিক উপাদানের তালিকা দেওয়া হলো যা সহজেই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় যোগ করা সম্ভব:

  • ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: মস্তিষ্কের প্রদাহ কমিয়ে অ্যাংজাইটি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইলিশ, চিংড়ি, সামুদ্রিক মাছ, চিয়া সিড ও আখরোটে এটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

  • ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: ‘রিলাক্সেশন মিনারেল’ নামে পরিচিত ম্যাগনেশিয়াম পেশি ও স্নায়ুকে শিথিল করে। কাঁচা কলা, কুমড়ার বীজ, পালং শাক ও ডার্ক চকলেট এই উপাদানের ভালো উৎস।

  • প্রোবায়োটিক ও ফার্মেন্টেড খাবার: দই, টক দই, ঘরে তৈরি আচার (গাজর, লেবু) অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রোবায়োটিক গ্রহণকারীদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।

  • জটিল শর্করা (Complex Carbs): ব্রাউন রাইস, ওটস, লাল আটা—এগুলো ধীরে ধীরে শর্করা রক্তে মিশিয়ে ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়, যা থেকে তৈরি হয় সেরোটোনিন। সাদা চাল বা চিনির মতো সরল শর্করা বরং মুড সুইং বাড়ায়।

যেসব খাবার বাড়ায় উদ্বেগ

শুধু ‘কী খাবেন’ তা জানা জরুরি, পাশাপাশি ‘কী এড়িয়ে চলবেন’ জানাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল অ্যাংজাইটি রোগীদের জন্য বিষের মতো কাজ করে। অতিরিক্ত কফি বা চা অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদস্পন্দন দ্রুত করে, যা উদ্বেগের লক্ষণকে আরও প্রকট করে তোলে। এছাড়া চিনিযুক্ত পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও ফাস্টফুড অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে।

খাদ্যাভ্যাস কেবল শুরু, শেষ নয়

পুষ্টিবিদ নাজমা খানম আরও জানান, “শুধু খাবার দিয়ে গুরুতর অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি সঠিক পুষ্টি একধরনের ‘সাপোর্ট থেরাপি’ হিসেবে কাজ করে।” তিনি পরামর্শ দেন, নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখা জরুরি।

রমজানের এক মাসের রোজা, তারপর ঈদের উৎসব, আর তার পরই বিনা প্রস্তুতিতে কর্মব্যস্তায় ফিরে যাওয়া। বছরের এই মাত্র ৪০ দিনের ব্যবধানে আমাদের শরীর অভ্যন্তরীণ ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম) বারবার বড় ধরনের টানাটানির মুখে পড়ে। খাওয়া-ঘুম থেকে শুরু করে হরমোনের নিঃসরণ—সব কিছুতে এই সময় আসে চরম অস্থিরতা।

আর এই অস্থিরতাকেই আমরা ভুল করে সাধারণ ক্লান্তি বলে উড়িয়ে দিই। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কয়েকটি লক্ষণ কিন্তু ইঙ্গিত দেয় যে শরীর ভেঙে পড়ার পথে। জেনে নিন কোন উপসর্গগুলোকে হালকাভাবে না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

শরীরের ঘড়িতে কেন পড়ে ধাক্কা?

ঈদ-উল-ফিতর মানেই খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান শেষে হুট করে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে যাওয়া। রমজানে সেহরি ও ইফতারের কারণে শরীর ঘুমের ধরণ, খাদ্য গ্রহণের সময় ও পরিমাণ, এমনকি পানি পানির চক্রে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ঈদের সময় মধ্যরাত পর্যন্ত জাগা, দিনের বেলা বিশ্রাম—এই অভ্যাসগুলো আবার দৈনন্দিন চাকরি বা ব্যবসার কঠোর সময়সূচির সঙ্গে সংগতি রাখে না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, হঠাৎ করেই যখন খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের সময় ও শারীরিক কর্মক্ষমতার মান তিনটি ধাপেই আমূল পরিবর্তন ঘটে, তখন শরীরের ‘অ্যাডাপ্টেশন’ মেকানিজম ব্যাহত হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. ফারজানা হক জানান, “এই সময়কালে রোগীরা প্রায়ই বলেন ‘শরীরে কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই’, ‘মাথা ঘুরায়’, ‘ঘুম ভাঙার পরও ক্লান্তি লাগে’। কিন্তু অনেকে এগুলোকে অবহেলা করেন, যা পরে বড় অসুস্থতার আকার নেয়।”

৪০ দিনের মধ্যে যে ৫ লক্ষণে সতর্ক হবেন আপনি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা, ঈদ ও স্বাভাবিক জীবনের এই সন্ধিক্ষণে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে তা শুধু ক্লান্তি নয়, বরং শরীরের ‘মালঅ্যাডাপ্টেশন’ বা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ:

  • অবিরাম মাথাব্যথা ও মস্তিষ্কের কুয়াশা (Brain Fog): হঠাৎ ক্যাফেইন বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ঘুমের প্যাটার্ন বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে রক্তনালির প্রসারণ-সংকোচনে সমস্যা হয়। মাইগ্রেন বা টেনশন headaches বেড়ে যায়। সঙ্গে কাজে মন বসাতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া—এগুলো ব্রেন ফগের ইঙ্গিত।

  • গ্যাস্ট্রিকের জটিলতা: রমজানে দীর্ঘক্ষণ খালি পেট থাকার পর ইফতার ও রাতের খাবারে ভাজাপোড়া খাওয়া। ঈদের পর আবার অফিসের তাড়াহুড়োয় অনিয়মিত খাবার। ফলে অম্বল, বুকজ্বালা, পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা প্রকট হয়। অনেক সময় একে সাধারণ বদহজম ভেবে অ্যান্টাসিড খেয়ে চললেও অন্ত্রের ভেতরের ভালো ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

  • অনিদ্রা ও অতিরিক্ত ঘুমের দোলাচল: রমজানের শেষ সপ্তাহে ইবাদতের জন্য রাত জাগা এবং ঈদের রাতে দীর্ঘক্ষণ জাগার পর যখন ভোরবেলা অফিসের জন্য উঠতে হয়, তখন ঘুমের চক্র সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে যায়। ফলে দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায়, কিন্তু রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম আসে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগেরও কারণ হতে পারে।

  • হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসের ধাক্কা: রোজায় অনেকে ওজন কমালেও ঈদের পর অল্প কয়েকদিনেই অনিয়ন্ত্রিত খাবার ও স্ট্রেস কর্টিসোল হরমোন বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে শরীরের মেটাবলিজম (বিপাকক্রিয়া) অস্থির হয়ে যায়। বিশেষ করে যাঁদের ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের সমস্যা আছে, তাঁদের জন্য এই সময়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

  • পেশির দুর্বলতা ও হৃদস্পন্দনের তারতম্য: রুটিন পরিবর্তনের সঙ্গে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি যদি থেকে যায়, তাহলে পেশিতে টান ধরা, পা ব্যথা করা এবং মাঝে মাঝে ধড়ফড় করা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় রোগী মনে করেন এটা শুধু ক্লান্তি, অথচ এটি ডিহাইড্রেশন বা পটাশিয়ামের অভাবের মারাত্মক সংকেত।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ‘ডিটক্স’ নয়, ‘রুটিন রিসেট’ জরুরি

চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময়টায় শরীরকে জোর করে কোনো ‘ডিটক্স’ ডায়েট দেওয়া বা এক্সট্রিম ওয়ার্কআউটে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নয়। বরং ধীরে ধীরে রুটিন ‘রিসেট’ করা জরুরি। ঘুমের সময় প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে আগে বাড়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান, এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে সুষম খাদ্য তালিকায় ফিরে আসা—এগুলো ধৈর্যের সঙ্গে করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) নিয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি বড় ট্যাংকার আসছে। এর মধ্যে প্রথমটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা তিনটি জাহাজে মোট প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এশিয়ার জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যেই একের পর এক এলএনজিভাহী জাহাজ আসায় স্বস্তি ফিরছে সরকারি ও বাণিজ্যিক পর্যায়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত সময়েই সবগুলো ট্যাংকার সচল রাখতে সক্ষম তারা।

অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম ট্যাংকার কুতুবদিয়ায়

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ৬১ হাজার ৯৯৭ টন এলএনজি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘এইচএল পাফিন’ ট্যাংকারটি গত বৃহস্পতিবার কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে। জাহাজটি ইতিমধ্যেই ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ‘এক্সেলারেট’-এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এই টার্মিনালটি থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, কুতুবদিয়ার ভাসমান টার্মিনালটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। ‘এইচএল পাফিন’ থেকে সেটি উত্তোলনের পর দেশের শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গার্হস্থ্য চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুটি ট্যাংকার পথে, ইন্দোনেশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসছে

চলতি সপ্তাহের মধ্যে আরও দুটি এলএনজিভাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার বোন্টাং এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে ৬১ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘নিউ ব্রেভ’ ট্যাংকারটি সমুদ্রপথে বাংলাদেশের দিকে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য থেকে প্রায় ৭০ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘সেলসিয়াস গ্যালাপাগোস’ নামের আরেকটি ট্যাংকার রওনা হয়েছে।

দুটি জাহাজই আগামী বুধবারের (৩ এপ্রিল) মধ্যে কুতুবদিয়ার ভাসমান টার্মিনালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেগুলো থেকেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে।

কেন এই জরুরি এলএনজি আমদানি?

দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের সিংহভাগ আসে দেশীয় উৎস থেকে। কিন্তু মাঠের চাপ কমে যাওয়ায় এবং শিল্প-বিদ্যুৎ খাতে চাহিদা বাড়ায় সম্প্রতি সরবরাহ ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছিল। গ্রীষ্মের শুরুতে বিদ্যুতের চাহিদা চরমে ওঠার আগেই জ্বালানি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই তিনটি ট্যাংকার থেকে সংগৃহীত এলএনজি দেশের গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হলে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়বে। এতে আসন্ন গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বন্দরের প্রস্তুতি ও ভাসমান টার্মিনালের সক্ষমতা

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরপর তিনটি এলএনজি ট্যাংকার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। কুতুবদিয়ায় অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল—‘এক্সেলারেট’ ও ‘এমএমটি’—সচল রয়েছে। একটি টার্মিনাল থেকে গ্যাস খালাসের পর পরবর্তী ট্যাংকারটি সংযুক্ত করতে স্বাভাবিক সময় লাগে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, জাহাজের আগমনের মধ্যবর্তী সময় ও টার্মিনালের অপারেশনাল সক্ষমতা বিবেচনায় রেখেই এই তিনটি জাহাজের আগমন পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ চিত্র

বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম স্থিতিশীল থাকায় সরকার এই মুহূর্তে আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছে। গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে এলএনজির দাম চড়া থাকায় বাংলাদেশকে আমদানি কমাতে হয়েছিল। এখন দাম কিছুটা নিম্নমুখী থাকায় বাড়তি জ্বালানি মজুত করা হচ্ছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলএনজি আমদানি নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ। দেশীয় উৎস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোর দেওয়ার পাশাপাশি এলএনজি আমদানির একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

প্রায় চার সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানের হুমকি আর জাহাজে হামলার আশঙ্কায় এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের এই মুখে দাঁড়িয়ে এখন তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, আর এই অচলাবস্থা কাটানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধান ও সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বললেও ইরানের ‘অপ্রচলিত যুদ্ধপদ্ধতি’ এবং ভৌগোলিক সুবিধার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে।

হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর বুকে এমন একটি জায়গা, যেখানে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি তেলবাহী জাহাজকে অতিক্রম করতে হয়। ওমান ও ইরানের মাঝে প্রসারিত এই ৩৯ কিলোমিটার চওড়া পথটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল অংশের পরিবহন পথ। শুধু তাই নয়, বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ফসফেট ও পটাশ সারের সরবরাহের প্রধান রুটও এটি। এই পথ বন্ধ মানে শুধু পেট্রোল পাম্প শুকানো নয়; বরং ক্ষুধার হাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার মতো বিপদ।

গত চার সপ্তাহ ধরে ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে একের পর এক হুমকি, কয়েকটি ট্যাংকারে রহস্যজনক বিস্ফোরণ এবং সাম্প্রতিক সময়ে এক জাপানি জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনায় শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে রাজি হচ্ছে না। বিমা কোম্পানিগুলো এই রুটে যাতায়াতের জন্য প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ফলে অধিকাংশ জাহাজই এখন হয় আদেন উপসাগরে আটকে রয়েছে, নয়তো কেপ অব গুড হোপের মতো দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করছে, যা যাতায়াতের সময় ও খরচ প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে।

ইরানের অস্ত্র: সস্তা ড্রোন ও ভূগোলের খেলা

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এত কঠিন কেন? বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে যা প্রচলিত সামরিক শক্তির জবাব দেওয়া কঠিন। প্রথমত, সস্তা ড্রোন ও সমুদ্রমাইনের মতো ‘অপ্রচলিত’ অস্ত্র। একটি মার্কিন ধ্বংসকারী জাহাজের দাম যেখানে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ইরানের একটি ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক হাজার ডলার। দ্বিতীয়ত, ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। হরমুজ প্রণালির উত্তর তীর সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এই সংকীর্ণ জলপথ থেকে তারা সহজেই ছোট দ্রুতগতির বোট ও ড্রোন পাঠিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানতে পারে।

মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোর পাহারা দিতে পারলেও প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক কনভয়ে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। ইরান পুরো প্রণালিকেই ‘বহিষ্কৃত অঞ্চল’ ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছে। আর সেই হুমকি তারা কার্যকর করছে প্রতিনিয়ত।

ট্রাম্পের দ্বিধা: কূটনীতি না কামান?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে এই সংকটের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন এবং তেলবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়ালে তা পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধের রূপ নিতে পারে—যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত নির্বাচনের আগে চান না। তাই তিনি এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথাও বলছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে প্রণালি খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সংকটের প্রভাব: দাম বাড়ছে, সরবরাহ কমছে

জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আগেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতোমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অবরোধ না কাটে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি হবে এক ‘কালো সোমবার’। বাংলাদেশের মতো দেশ, যার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর, সেখানেও দাম বাড়ার ধাক্কা পড়বে বহুমাত্রিক।

যে চাঁদে অ্যাপোলো মিশন কেবল পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছিল, সেখানে এবার বসতি গড়ার ডাক দিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। শুধু নভোচারী পাঠানো নয়, সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ ও মহাকাশের গভীরে অভিযানের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহাপরিকল্পনা সম্প্রতি ‘ইগনিশন’ অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই উদ্যোগে নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, এখন প্রতিযোগিতা ‘বছরের’ নয়, ‘মাসের’ হিসাবে গণনা করা হবে।

‘অসম্ভবকে সম্ভব’-এর নতুন সংজ্ঞা

নাসার নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান, যিনি নিজেও বেসরকারি মহাকাশ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁর প্রথম বার্তায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন সময়ের মানদণ্ড বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘নাসা আবারও প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চাঁদে ফেরা, সেখানে একটি ঘাঁটি তৈরিসহ মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

এই ঘোষণা কেবল একটি মিশনের সময়সীমা নির্ধারণ নয়; এটি পুরো কৌশলগত দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। নাসা এখন ‘বারবার যাওয়া’র প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায়। এর অর্থ, চাঁদে যাওয়া আর কোনো বিরল ঘটনা থাকছে না। বরং, পৃথিবীর কোনো প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে নিয়মিত ফ্লাইটের মতো চাঁদেও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ল্যান্ডিং প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা এক সময়ের কল্পবিজ্ঞান হলেও আজ বাস্তবতার পথে।

আর্টেমিসের নতুন অধ্যায়: ছয় মাস অন্তর মিশন

এই পরিকল্পনার প্রথম মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে ‘আর্টেমিস প্রোগ্রাম’। ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনের মাধ্যমে আবারও মানবপা পড়বে চাঁদের মাটিতে। তবে সেখানেই থামছে না গল্প। তার পরবর্তী সময় থেকে ছয় মাস অন্তর নিয়মিত মিশন পাঠানোর রোডম্যাপ তৈরি করেছে নাসা। এই মিশনগুলো কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেগুলো হবে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের ধাপ।

‘আর্টেমিস বেস ক্যাম্প’ নামে পরিচিত এই ঘাঁটিতে থাকবে আবাসিক ইউনিট, গবেষণাগার ও যানবাহন পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে এই ঘাঁটি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, কারণ সেখানে সূর্যালোকের পাশাপাশি বরফাকৃতির পানির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা থেকে অক্সিজেন, পানি ও জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব।

নতুন প্রশাসকের বক্তব্যে ‘মাসের হিসাবে’ প্রতিযোগিতার যে উল্লেখ রয়েছে, তা কেবল সময়গত বিষয় নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। চীনও তাদের ‘আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন’ (আইএলআরএস) তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে চাঁদের মাটিতে এখন কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, সেখানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়, তাদের মিত্র ও বেসরকারি অংশীদারদের নিয়ে গড়া এই কাঠামোই হবে চাঁদের প্রথম মানবিক বসতি।

নাসার এই পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হলো বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম (এইচএলএস) তৈরিতে প্রতিযোগিতা করছে। নাসা আর নিজে একা সব কিছু তৈরি করছে না; বরং তারা প্রযুক্তি কিনছে এবং বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে ‘পরিবহন ব্যবসায়ী’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই পদ্ধতি মিশনের ব্যয় কমিয়ে আনার পাশাপাশি গতি বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, এই চাঁদে ঘাঁটি নির্মাণের লক্ষ্য শেষ কথা নয়। নাসা স্পষ্ট করে বলেছে, চাঁদ হবে মঙ্গল ও তার বাইরের মহাকাশে মানব অভিযানের ‘প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড’ বা প্রস্তুতির মঞ্চ। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ও রেডিয়েশন পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেই মানবজাতি পরবর্তী লক্ষ্য মঙ্গল গ্রহের দিকে পা বাড়াবে।

আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে নেপালের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখা হয়েছে। ‘বালেন’ নামে পরিচিত র্যাপার ও প্রকৌশলী বালেন্দ্র শাহ দেশের ৪৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত বছর জেন-জেডের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এই শপথগ্রহণ হলো। শপথের আগের রাতে প্রকাশ করা এক র্যাপ গানে তিনি ‘অবিভক্ত নেপালি’ হয়ে ইতিহাস গড়ার আহ্বান জানান, যা কয়েক ঘণ্টায় ২০ লাখের বেশি দর্শক দেখেছে ।

শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র, একজন কাঠামো প্রকৌশলী এবং জনপ্রিয় র্যাপার। ৩৫ বছর বয়সী এই নেতা নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্থান পেয়েছেন এবং তিনিই প্রথম মধেশি অঞ্চল থেকে দেশের শীর্ষ নির্বাহী পদে আসীন হলেন ।

শপথ নেওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে গান প্রকাশ করে তিনি দেখিয়ে দিলেন, জনতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যম এখনও মঞ্চ ও মাইক। ‘জয় মহাকালী’ শিরোনামের এই গানে তিনি গেয়েছেন, ‘আমার হৃদয় সাহসে ভরা, লাল রক্ত ফুঁড়ে উঠছে; আমার ভাইয়েরা আমার পাশে, এবার আমরা জেগে উঠবো।’ প্রচারণার ভিডিওতে ঘেরা এই গানের একটি লাইন যেন তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে চিহ্নিত করে: ‘আমার নিঃশেষ হোক না শ্বাস, আমি চিতাবাঘের গতিতে দৌড়াবো’ ।

প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল নেপালের সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য উদাহরণ। রাষ্ট্রপতি ভবন ‘শীতল নিওয়াস’-এ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাতটি শঙ্খের ধ্বনির মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। ১০৮ জন হিন্দু ‘বটুক’ (যুব ব্রাহ্মণ) বেদ মন্ত্র পাঠ করেন এবং ১০৭ জন বৌদ্ধ লামা ‘মঙ্গল বচন’ পাঠ করেন। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাউডেল সংবিধানের ৭৬(১) ধারার অধীনে তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান ।

শপথগ্রহণে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’, মাধব কুমার নেপালসহ অনেকে। তবে চারবারের প্রধানমন্ত্রী ও ঝাপা-৫ আসনে বালেন্দ্র শাহর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত কে পি শর্মা অলির অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে। জি-৫ আসনে বালেন পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট, যেখানে অলি পেয়েছেন মাত্র ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট ।

‘জেন-জেডের আদেশ’ এবং চ্যালেঞ্জের মেয়াদ

বালেনের এই অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ নির্বাচনী জয় নয়। এটি ছিল গত বছরের সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ গণআন্দোলনের ফলাফল। সে সময় সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন প্রাণ হারান। সেই আন্দোলনের মাধ্যমেই কার্যত উৎখাত হন কে পি শর্মা অলি। সেই শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সুষিলা কার্কি বিদায়বেলায় বলেছেন, ‘জনগণ জেন-জেড আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছেন’ ।

কার্কি আশা প্রকাশ করেছেন যে, তরুণ নেতৃত্বে নতুন সরকার দুর্নীতি নির্মূল, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দেশের মধ্যেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে বালেনকে সামনে নিয়ে আসা সেই আন্দোলনের তদন্ত প্রতিবেদন এখন তাঁর সামনেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৬৩ জনের মধ্যে ৪৮ জনের বুক ও মাথায় গুলি লেগেছে ।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই বালেন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রতিরক্ষা ও শিল্প মন্ত্রক নিজের কাছে রেখে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন স্বর্ণিম ওয়াগ্লেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেয়েছেন সুধান গুরুং, আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আছেন শিশির খানাল ।

জিভের ডগায় আগুন, চোখেমুখে পানি—অথচ বারবার বাড়িয়ে নেওয়া সেই ঝালের কামড়। শুধু স্বাদের নেশা না, যাঁরা ঝাল খেতে ভালোবাসেন, তাঁদের এই অভ্যাস আসলে এক ধরনের ‘দুঃসাহসিক অভিযান’। সাম্প্রতিক নিউরোসায়েন্টিফিক গবেষণা বলছে, এই ঝালপ্রীতি শুধু রসনাবিলাস নয়, এর ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিত্ব, মনস্তত্ত্ব আর দেহের এক জটিল রাসায়নিক সমীকরণ। আজকের প্রতিবেদনে জানব, কেন পৃথিবীর এক বড় অংশের মানুষ স্বেচ্ছায় এই ‘যন্ত্রণা’ বরণ করে নেন এবং এই অভ্যাস তাদের ব্যক্তিত্বের কোন দিকটির ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালা নয়, উৎকণ্ঠার মোড়ক

ঝাল খাওয়া মানেই মূলত ক্যাপসাইসিন নামক একটি যৌগের সঙ্গে লড়াই করা। মরিচের এই উপাদানটি আমাদের জিভের TRPV1 রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে—যে রিসেপ্টর সাধারণত ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা শনাক্ত করে। অর্থাৎ, মরিচ খেলে মস্তিষ্ক ভুল বুঝে মনে করে, মুখের ভেতর আগুন জ্বলছে।

কিন্তু যাঁরা এই অনুভূতি পছন্দ করেন, তাঁরা ঠিক কী পান? মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যক্তিরা এক ধরনের ‘বিবিধ সংবেদনশীলতা’ (Sensation Seeking) নিয়ে থাকেন। তাঁরা জানেন এটা জ্বালা, কিন্তু এই জ্বালা কাটিয়ে ওঠার পর মস্তিষ্ক যে ‘এন্ডরফিন’ নিঃসরণ করে, তা আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক মাদক। ঝাল খাওয়ার পর যে হালকা উৎকণ্ঠা আর তার পরের স্বস্তি আসে, তা অনেকটা রোলার কোস্টারে চড়ার মতো—ভয় আর রোমাঞ্চের এক বিমূর্ত মিশ্রণ।

বৈজ্ঞানিক কারণ: কেন বারবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা?

গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত ঝাল খান, তাঁদের শরীর ধীরে ধীরে ক্যাপসাইসিনের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে। তবে এর বাইরেও এই ঝালপ্রীতি জিনগতভাবে নির্ধারিত হতে পারে। ‘ডেইলি মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাঁদের মধ্যে ‘ডোপামিন’ রিসেপ্টরের তারতম্য বেশি, তাঁরা সাধারণত ঝাল খেতে বেশি পছন্দ করেন। ডোপামিন আমাদের আনন্দের অনুভূতি জাগায়। যখন কেউ ঝাল খান, মস্তিষ্ক ভাবে তাঁকে ‘বিপদ’ থেকে বাঁচাতে এন্ডোরফিন ছাড়ে, আর এন্ডোরফিন ডোপামিনের উৎপাদন বাড়ায়। অর্থাৎ, ঝাল খাওয়া আসলে একটা রাসায়নিক পুরস্কার।

এছাড়াও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঝাল খাওয়ার সঙ্গে ‘টেস্টোস্টেরন’ হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষদের মধ্যে ঝালপ্রিয়তা বেশি দেখা গেলেও, বর্তমানে নারীদের মধ্যেও এর প্রবণতা বাড়ছে। এটি শুধু ‘পুরুষসুলভ’ চ্যালেঞ্জ না, বরং আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও সহনশীলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঝালপ্রিয় মানুষ: ব্যক্তিত্বের কয়েকটি রেখাচিত্র

সামাজিক আচরণ বিশ্লেষকদের মতে, যাঁরা খাবারে অতিরিক্ত ঝাল দিতে পছন্দ করেন, তাঁরা সাধারণত:

  • সাহসিক ও ঝুঁকিপ্রবণ: নতুন কিছু চেষ্টা করতে তাঁরা কখনো পিছপা হন না। শুধু খাবার নয়, জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁরা বাঁধা ভাঙতে পছন্দ করেন।

  • সহনশীলতা বেশি: ঝাল খাওয়ার মধ্যে রয়েছে ধৈর্যের পরীক্ষা। যাঁরা এটি সহজে নেন, তাঁরা জীবনের জটিল পরিস্থিতিও তুলনামূলক শান্তভাবে মোকাবিলা করেন।

  • সামাজিকভাবে সক্রিয়: ঝাল খাওয়া প্রায়ই সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ। ‘চ্যালেঞ্জ’ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাওয়া, প্রতিযোগিতা করা—এসব তাঁদের জন্য বন্ধনের সেতু।

গরমের দেশে ঝালের রাজনীতি

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে ঝাল খাওয়া শুধু ব্যক্তিত্বের বিষয় নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে ঝাল খাওয়ার একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। ঝাল শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ঘাম বাড়ায়, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আর্দ্র আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া নাশক হিসেবে মরিচের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। ফলে, যাঁরা এখানে ঝাল খান, তাঁরা হয়তো অজান্তেই স্বাস্থ্যসচেতনতা ও ঐতিহ্যের ধারক।

ঝালের নেশা কি ঠিক?

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতি ঝাল খাবার যেমন ‘ক্যারোলিনা রিপার’ বা ‘ঘোস্ট পেপার’-এর মতো চরম মাত্রার ঝাল খেলে পাকস্থলীর ক্ষতি হতে পারে। তবে পরিমিত মাত্রায় ঝাল খাওয়া বিপাকক্রিয়া বাড়ায়, ওজন কমায় এবং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে।