ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ২৮ দিনের মাথায় ফেটেছে জোটের ভিতরকার টানাপোড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোনে চরম উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। ‘রাজ পরিবর্তন’ নিয়ে নেতানিয়াহুর ‘অতিরিক্ত আশাবাদী’ অবস্থানকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেন ভ্যান্স, যা দুই মিত্রশিবিরের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ব্যবধানের ইঙ্গিত দিচ্ছে ।
কেন ‘গরম’ হলো ফোনালাপ?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার (২৩ মার্চ) সংঘটিত এই ফোনালাপটিকে ‘টেনশনে ভরা’ ও ‘কঠিন’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সূত্রের খবর, ভ্যান্স সরাসরি নেতানিয়াহুকে বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পূর্বাভাস ‘অতিমাত্রায় আশাবাদী’ ছিল। বিশেষ করে ইরানে সরকার পতন কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে নেতানিয়াহু যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা বাস্তবের তুলনায় অনেকটাই বাড়িয়ে বলা হয়েছিল ।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, “যুদ্ধের আগে ‘বিবি’ (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) সেটাকে প্রেসিডেন্টের কাছে খুব সহজ বলে সেল করেছিলেন। রাজ পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি বলে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর (নেতানিয়াহু) ওই সব বক্তব্য সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ও বাস্তববাদী ছিলেন” ।
যুদ্ধের গতি আর ‘বাস্তব’ মূল্যায়ন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ বিমান অভিযান শুরুর পর থেকে এখনও পর্যন্ত তেহরানে প্রত্যাশিত সরকার পতন ঘটেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এখনো টিকে আছে। এই বাস্তবতাই মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। ভ্যান্স, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুদ্ধে ‘মিশন ক্রিপ’ বা লক্ষ্যবিচ্যুতির বিষয়ে সতর্ক থাকার পক্ষে সোচ্চার, তিনি নেতানিয়াহুকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান ।
উল্লেখ্য, ইরাক যুদ্ধের ভেটেরান ভ্যান্স শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত স্থল অভিযানের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি প্রশাসনের মধ্যে অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে শুধু যুদ্ধের সময়সীমা নয়, মার্কিন গোলাবারুদের মজুতের ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন ।
উপায়ন শেষে ‘অপারেশন’ বনাম ‘কূটনীতি’
এই উত্তপ্ত ফোনালালপের পরের ঘটনা আরও জটিল। ফোনালাপের পরের দিনই ইসরায়েলের একটি ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায় যে, পশ্চিমতীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হিংসার বিষয়ে নেতানিয়াহুকে ‘চিৎকার করে’ ধমক দিয়েছেন ভ্যান্স। যদিও ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম উভয় পক্ষই এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় ।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এটি নেতানিয়াহুর কাছের কেউ ‘অপারেশন’ হিসেবে ছড়িয়ে দিতে পারেন, যাতে ভ্যান্সের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, “এটি জেডির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের একটি অপারেশন” । মার্কিন গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি আলোচনায় ভ্যান্সের ক্রমবর্ধমান ভূমিকায় খুশি নয় তেল আবিব। ইরান যদি ভ্যান্সের সঙ্গেই আলোচনা করতে চায়, তাহলে সেটা ইসরায়েলের জন্য মোটেই আরামদায়ক নয়—এই ধারণা থেকেই এই ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইন’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা ।
আমেরিকা চায় ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’, ইসরায়েল চায় ‘চূড়ান্ত আঘাত’
এই মনোমালিন্যের গভীরে রয়েছে কৌশলগত লক্ষ্যের পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকা ইরানে ভেনেজুয়েলার মডেলে সরকার পরিবর্তন চায়—অর্থাৎ সরকারের হাত বদল হবে, কিন্তু দেশ ধ্বংস হবে না। অন্যদিকে, ইসরায়েল চায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার ‘স্থায়ী ও চূড়ান্ত’ ধ্বংস ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহুর একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন যেখানে ইরানের জনগণকে সরাসরি রাস্তায় নেমে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানানোর কথা ছিল। ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেন, “জনগণকে রাস্তায় নেমে আত্মঘাতী হতে বলার কী দরকার?” ।


