ময়মনসিংহ নগরীতে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা ঘুম থেকে না ওঠায় দরজা ভেঙে মো. সোহান (১৯) নামে এক শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ।

সোমবার (২ মার্চ) বিকেল ৪টার পর সানকিপাড়া এলাকার একটি ছাত্র মেসে এ ঘটনা ঘটে। উদ্ধার অভিযানের ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সানকিপাড়া হেলথ অফিসার গলির ওই মেসে বসবাস করতেন সোহান। সহপাঠী ও মেসের অন্য শিক্ষার্থীরা জানান, সকাল থেকেই তার কক্ষে কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। বারবার দরজায় কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মিলছিল না। দুপুর গড়ানোর পরও একই পরিস্থিতি থাকায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

মেসের এক বাসিন্দা বলেন, “সাধারণত সকালে সোহান ক্লাস বা কোচিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিত। কিন্তু সেদিন সকাল ৯টার পরও তার দরজা বন্ধ ছিল। ফোনেও কল দেওয়া হয়, কিন্তু রিসিভ করেনি।” প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, হয়তো অসুস্থ বা গভীর ঘুমে আছেন। তবে দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পাওয়ায় বিকেলে বিষয়টি স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশকে জানানো হয়।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। কক্ষের ভেতরে সোহানকে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি জীবিত এবং তেমন কোনো শারীরিক জটিলতা নেই। এ ঘটনায় স্বস্তি ফিরে আসে সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেউ মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। মুহূর্তেই সেটি ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা সতর্কতার সঙ্গে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করছেন। ভিডিও ঘিরে নানা মন্তব্যও দেখা গেছে—কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কেউ আবার শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “প্রাথমিকভাবে এটি কোনো অপরাধজনিত ঘটনা বলে মনে হয়নি। দীর্ঘ সময় দরজা বন্ধ থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে উদ্ধার করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই সঠিক পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা বা শারীরিক ক্লান্তি তরুণদের মধ্যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের কারণ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাত জাগা, অনলাইন নির্ভরতা এবং অনিয়ন্ত্রিত রুটিন এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পরিবার ও সহপাঠীদের নজরদারি ও খোঁজখবর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের ১৩১টি শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা ৫৫০ জন ছাড়িয়েছে।

সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংস্থাটি বলছে, দেশজুড়ে ব্যাপক ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চলছে।

ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সর্বশেষ বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক হামলায় আবাসিক এলাকা, অবকাঠামো ও জনবহুল অঞ্চল ক্ষতির মুখে পড়েছে। হতাহতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কারণ বহু এলাকায় এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের কাজ চলছে। আহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে তা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামলার লক্ষ্যবস্তু ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও, মানবিক সংকট যে দ্রুত গভীর হচ্ছে—তা স্পষ্ট। সংস্থাটি জানিয়েছে, রেড ক্রিসেন্টের মানবিক মিশনের নেতৃত্বে উদ্ধার তৎপরতা বিরতিহীনভাবে চালানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন রয়েছে এবং দেশজুড়ে ১ লাখেরও বেশি উদ্ধারকর্মী পূর্ণ সতর্কাবস্থায় রয়েছেন।

এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রায় ৪০ লাখ স্বেচ্ছাসেবকের একটি নেটওয়ার্ক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার জন্য বিশেষজ্ঞ দলও গঠন করা হয়েছে, কারণ হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একসঙ্গে এতগুলো শহরে হামলা ইরানের ভেতরে ব্যাপক অবকাঠামোগত চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার খবর পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিছু এলাকায় অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির স্থাপন করা হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা কেবল সামরিক সংঘাতের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এর মানবিক প্রভাব দ্রুত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে। শরণার্থী সংকট, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার নিচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনের দাবি জোরদার হচ্ছে। তবে এখনো কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত মেলেনি।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস।

সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) এই বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোনো ছবি, ভিডিও বা সংবাদ শেয়ার, লাইক বা কমেন্ট থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় আইন লঙ্ঘন না হয়।

এই বিজ্ঞপ্তি আসার পেছনে রয়েছে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বের ঘটনা ঘটছে।

সৌদি আরবের আকাশপথ এখনও সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও পরিস্থিতি অনিশ্চিত। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা, বিশেষ করে যারা ছুটিতে দেশে যাওয়া-আসা করছেন বা নতুন চাকরিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন, তারা বিপাকে পড়েছেন। দূতাবাসের এই বিজ্ঞপ্তি তাদের নিরাপত্তা ও আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য জারি করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের শান্ত থাকতে হবে এবং গুজবের ফাঁদে পা না দিতে হবে। সৌদি আরবের কঠোর আইন অনুসারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেকোনো সংবেদনশীল ছবি বা ভিডিও আপলোড, প্রচার বা শেয়ার করলে গুরুতর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন।

দূতাবাসের এই সতর্কতা প্রবাসীদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়াতে সহায়ক হবে।

আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তিতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা বা ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিল বা পুনর্নির্ধারণের ঘটনা বেড়েছে। এতে হাজার হাজার প্রবাসী আটকে পড়েছেন বা ভোগান্তিতে পড়েছেন। দূতাবাসের এই পরামর্শ যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা থেকে রক্ষা করবে।

সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশ শ্রমিক ও কর্মী। এই অঞ্চলের অস্থিরতা তাদের জীবনযাত্রা, রেমিট্যান্স এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগকে প্রভাবিত করছে। দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তি প্রবাসীদের মানসিক শান্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের দায়িত্বশীল আচরণের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদ প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২ মার্চ) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। জামায়াতকে নাম চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে, যাতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এটি বাস্তবায়ন করা যায়।

এই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর গঠিত জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

সেই সনদকে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে বিবেচনা করে সরকার এখন থেকেই তার বাস্তবায়ন শুরু করতে চায় বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, “আমরা জুলাই সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সমঝোতায় এসেছি, তার বাস্তবায়ন এখন থেকেই শুরু করতে চাই।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতকে মৌখিকভাবে এবং সাক্ষাতে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদি জামায়াত সম্মত হয়, তাহলে তাদের মনোনীত প্রার্থী স্পিকার নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নিতে পারবেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, তাই এই প্রস্তাবের সময়োপযোগিতা অনেক।

জামায়াতে ইসলামীকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে এটিকে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন।

জুলাই আন্দোলনের পর বিভিন্ন দলের মধ্যে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তার ধারাবাহিকতা এতে বজায় রাখা যাবে। তবে কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়াতের সাংবিধানিক অবস্থান এবং অতীতের বিতর্কিত ভূমিকা বিবেচনায় এই পদ দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত। জামায়াতের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে তারা বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে।

এই প্রস্তাবের পেছনে সরকারের লক্ষ্য স্পষ্ট—সংসদকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সক্রিয় করে তোলা। ঐতিহ্যগতভাবে ডেপুটি স্পিকার পদ সরকারি দলের হয়, কিন্তু বিরোধী দল থেকে নিয়োগ দেওয়া হলে সংসদীয় আলোচনায় ভারসাম্য আসবে। সালাহউদ্দিন আহমদের কথায়, এটি রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং তেহরানের পাল্টা আক্রমণের জেরে বিস্তীর্ণ এলাকার আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা দীর্ঘদিনের জন্য বিলম্বিত। দুবাই, দোহা, আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ হাব বন্ধ থাকায় লাখো যাত্রী আটকে পড়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলোতেও বড় ধাক্কা লেগেছে—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শত শত প্রবাসী ও ট্রানজিট যাত্রী বিপাকে। এমন সংকটে যাত্রীদের অধিকার কী, তা জানা এখন অত্যন্ত জরুরি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান পাল্টা আক্রমণ করে। এতে ইরান, ইসরায়েল, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সিরিয়া, জর্ডানসহ একাধিক দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ হয়ে যায়।

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—বিশ্বের ব্যস্ততম হাব—তিন দিন ধরে বন্ধ। দোহা ও আবুধাবির হামাদ ও জায়েদ বিমানবন্দরও একই অবস্থা। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ৩ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এই সংখ্যা কোভিড মহামারির পর সবচেয়ে বড় বিঘ্ন।

বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়েছে তীব্রভাবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ১০০-এরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

এর মধ্যে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ফ্লাইদুবাই, এয়ার আরাবিয়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ বড় বড় ক্যারিয়ারের ফ্লাইট রয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরেও ২০টির মতো ফ্লাইট বাতিল।

হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক, উমরাহ যাত্রী ও ইউরোপ-আমেরিকাগামী ট্রানজিট যাত্রী বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন। অনেকে রাত কাটিয়েছেন টার্মিনালে, খাবার-পানীয়ের অভাবে কষ্ট পেয়েছেন। কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইসি ২৬১/২০০৪ নিয়ম বা অনুরূপ আইনের আওতায় পড়ে। যুদ্ধ বা ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ (extraordinary circumstances) হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এয়ারলাইনগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য নয়। তবে তারা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে বাধ্য।

– ফ্লাইট বাতিল হলে এয়ারলাইনকে অবশ্যই বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে বা পুরো টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হবে।
– দীর্ঘ বিলম্ব বা বাতিলের ক্ষেত্রে খাবার, পানীয়, হোটেল থাকার ব্যবস্থা ও বিমানবন্দর-হোটেল যাতায়াতের সুবিধা দিতে হবে।
– যাত্রী যদি আর ভ্রমণ না করতে চান, তাহলে পুরো রিফান্ড পাওয়ার অধিকার আছে।
– বাংলাদেশি এয়ারলাইনগুলোর ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) ও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

বিমান সংস্থাগুলো যেমন এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, বিমান বাংলাদেশ—সবাই যাত্রীদের বিকল্প তারিখে ফ্লাইট বা রিফান্ডের অফার দিচ্ছে। কিন্তু ফোন লাইন জ্যাম, ওয়েবসাইটে ভিড়—এসবের কারণে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই বিঘ্ন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার এনার্জি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইউরোপের পাইকারি গ্যাস বাজারে দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

সোমবার (২ মার্চ, ২০২৬) এই ঘোষণার পর ডাচ টিটিএফ হাবের দাম ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছেছে।

কাতার এনার্জি, যা বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, রাস লাফান শিল্পনগরীতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করেছে। এই স্থাপনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে এশিয়া ও ইউরোপে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাঠানো হয়।

কাতার এনার্জির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পনগরীতে সামরিক হামলার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছে।” পুনরায় চালু করার সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি, যা বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা থেকে উদ্ভূত, ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং কাতার-সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমস্ত এলএনজি রপ্তানি হয়।

ইরানের হামলা কাতারের অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হেনেছে, যার ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জলের ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট হতে পারে।

ইউরোপ, যা ২০২২ সালের পর রাশিয়ান পাইপলাইন গ্যাস থেকে মুখ ফিরিয়ে কাতারের এলএনজির উপর নির্ভরশীল হয়েছে, এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কাতার ইউরোপের এলএনজি আমদানির ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে। সোমবার সকালে দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও, উৎপাদন বন্ধের খবরে তা ৫০ শতাংশে পৌঁছে।

ডাচ টিটিএফ, যা ইউরোপের বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত, ফ্রন্ট-মান্থ চুক্তির দাম ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে ৪৬.৫২ ইউরো প্রতি এমডব্লিউএইচ হয়েছে, যা প্রায় ১৫.৯২ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউয়ের সমান। এই দামবৃদ্ধি গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়।

ডাচ টিটিএফ হাব ইউরোপীয় গ্যাস বাজারের মূল নির্ধারক। এটি একটি নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ-চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সরবরাহের ঘাটতি এই প্রক্রিয়াকে অস্থির করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে, যা ইউরোপের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

এশিয়া, যা কাতারের এলএনজির প্রধান গ্রাহক,ও এই সংকটে প্রভাবিত। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে, যা বিশ্বব্যাপী দামবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতে, হরমুজ প্রণালী অবরোধ অব্যাহত থাকলে এশিয়া ও ইউরোপে দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানিকারকরা, যেমন চেনিয়ার এনার্জি, এতে লাভবান হচ্ছে, তাদের শেয়ার ৬ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বিস্তৃত প্রভাবকে তুলে ধরেছে। তেলের দামও ৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপের দেশগুলো বিকল্প সরবরাহ খুঁজছে, কিন্তু শীতকালে এটি চ্যালেঞ্জিং।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে গোপন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান হয়েছে। সিআইএ কয়েক মাস ধরে খামেনির অবস্থান এবং চলাচল নজরে রেখে তথ্য সংগ্রহ করে, যা ইসরায়েলকে সেই মারাত্মক হামলার জন্য সহায়তা করে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গত কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, খামেনির অবস্থান এবং দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা গড়ে উঠেছিল। শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, যেখানে খামেনি উপস্থিত থাকবেন। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সিআইএ ইসরায়েলের সঙ্গে শেয়ার করে, যা হামলার সময় নির্ধারণে সহায়ক হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ‘শিল্ড অব জুডাহ’ নামে পরিচিত। এই হামলা মূলত রাতে পরিকল্পিত ছিল, কিন্তু সিআইএর তথ্যের ভিত্তিতে তা এগিয়ে আনা হয়। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সিআইএর সমন্বয়ে এই অভিযানে খামেনি এবং অন্যান্য নেতাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। ফলে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক এবং সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রক্সি গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুক্ততা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান নিয়মিত। ২০১৮ সালে ইরানের গোপন নথি চুরির ঘটনা থেকে শুরু করে স্টাক্সনেট সাইবার হামলা—সবকিছুতেই এই সহযোগিতা দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা এবং সামরিক ঘাঁটিতে হামলায়ও এই যৌথতা স্পষ্ট। খামেনির ক্ষেত্রে সিআইএর ‘হাই ফিডেলিটি’ তথ্য ইসরায়েলকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সাহায্য করে।

এই ঘটনার পটভূমিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের শত্রুতা। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হিজবুল্লাহ, হুতি বিদ্রোহীদের মতো গ্রুপগুলোকে সমর্থন দেওয়া ইসরায়েলের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে এই হামলা ইরানের শাসনব্যবস্থা উল্টে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত। তবে এটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুদ্ধকে উসকে দিয়েছে বলে সমালোচনা উঠেছে। ইরান পালটা হামলা চালিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, খামেনির মৃত্যু ইরানের অভ্যন্তরে ক্ষমতা সংগ্রামকে তীব্র করবে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। তবে এটি ইরানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যেমনটি ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এই কৌশল সফল হবে কি না, তা সময় বলবে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশের সংবিধান অনুসরণ করে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিল নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবে, যাতে ৬৭ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ।

খামেনির মৃত্যু ইরানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গত ৩৭ বছর ধরে দেশের ধর্মীয়, সামরিক এবং রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। সাম্প্রতিক ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে অন্তর্বর্তী কাউন্সিল গঠিত হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ-কে নিয়ে গঠিত।

কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য এবং এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের দ্বারা নির্বাচিত। ১৯৫৯ সালে ইয়াজ্দ প্রদেশের মেয়বোদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণকারী আরাফি কোমের প্রখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। তিনি আল-মুস্তাফা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এবং ইরানের সেমিনারিগুলোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরাফি শিয়া মতবাদ প্রচারে সক্রিয় এবং সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ধর্মীয় আদর্শ ছড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন। ২০১৯ সাল থেকে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি ইরানের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ইরানের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি নির্বাচনের দায়িত্ব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর উপর। এই ৮৮ সদস্যের সংস্থা শিয়া ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত, যারা প্রতি আট বছরে নির্বাচিত হয়। খামেনির মৃত্যুর পর এই অ্যাসেম্বলি দ্রুত একটি নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। তবে এই প্রক্রিয়া গোপনীয় এবং ধর্মীয় যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিপ্লবী আদর্শের উপর নির্ভর করে। অতীতে খোমেনির পর খামেনির নির্বাচনও এমনই দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়েছিল।

এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক। খামেনির নেতৃত্বে ইরান পরমাণু কর্মসূচি, হিজবুল্লাহ এবং হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁর মৃত্যু এবং চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাউন্সিলকে সামরিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইরানের বিদেশনীতিতে বড় পরিবর্তন হবে না, তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সংগ্রাম দেখা দিতে পারে।

আরাফির ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিপ্লবী মতাদর্শের অনুসারী এবং খামেনির বিশ্বস্ত বলে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে কাউন্সিল ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে থাকায় এই কাউন্সিলের প্রথম পরীক্ষা হবে যুদ্ধ পরিচালনা।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের মধ্যে সেখানকার বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবস্থা জানতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

রোববার সকালে সচিবালয়ে এই সাক্ষাতে যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে, এবং প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সকালে দেখা করেন। ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশিরা কী অবস্থায় আছেন, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের ফলে অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা প্রবাসীদের ফিরতে বাধা সৃষ্টি করছে।”

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সংখ্যা বিপুল—আনুমানিক ৮ মিলিয়ন বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন, যা দেশের মোট প্রবাসীদের প্রায় ৬০ শতাংশ। সৌদি আরবে একাই প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। এই অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাবে তাদের জীবন ও কর্মক্ষেত্রে হুমকি দেখা দিয়েছে। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে বিমানবন্দর বন্ধ, বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ায় অনেকে আটকে পড়েছেন।

সাম্প্রতিক ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর দুবাই, দোহা, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বিমানবন্দরগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা বাংলাদেশি প্রবাসীদের দেশে ফেরার পথে বড় বাধা। উদাহরণস্বরূপ, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক হাব—পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে করে কাতার, কুয়েত, ইরাক, ইরানসহ অনেক দেশে ফ্লাইটের ৫০ শতাংশেরও বেশি বাতিল হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিপদজনক। উপসাগরীয় যুদ্ধ বা সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনায় প্রবাসীদের জীবনহানি, চাকরি হারানো এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো গাল্ফ দেশগুলোতে প্রবাসীদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে। যুদ্ধের কারণে শ্রমিকরা শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা, বেতন অপ্রাপ্তি এবং শোষণের শিকার হন। এছাড়া, অবৈধ প্রবাসীরা আটক হলে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।

প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠক নতুন সরকারের প্রবাসী কল্যাণে অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে ১৯৭৬ সাল থেকে। যুদ্ধের ফলে এই প্রবাহ কমলে দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। সরকারকে প্রবাসীদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে, যেমন সুরক্ষা সেল গঠন বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আজ সচিবালয়ে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মাকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের খবর যেন না শোনা যায়।

রোববার দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এই কথা জানান, যা দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

এদিন সকালে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে সচিবালয়ে আসেন। নতুন সরকার গঠনের পর এটি ছিল তাঁর রুটিন সাক্ষাৎ, কিন্তু আলোচনায় সীমান্ত নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে।

মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “আমি হাইকমিশনারকে বিশেষভাবে বলেছি, সীমান্ত হত্যা যেন আর না হয়। বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যে নিয়মিত বৈঠক চালিয়ে যাওয়া দরকার, যাতে এমন ঘটনা যতটা সম্ভব এড়ানো যায়।”

বাংলাদেশ-ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা স্থলসীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্তে গত কয়েক দশকে শত শত বাংলাদেশি নাগরিক বিএসএফ-এর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গরু চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অন্যান্য কারণে এসব ঘটনা ঘটে, যা দুই দেশের সম্পর্কে চিড় ধরায়। বিশেষ করে ২০১০-২০২০ সালের মধ্যে হত্যার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমলেও, এখনও প্রতি বছর কয়েকজনের মৃত্যুর খবর আসে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ জন্মায়।

এই বৈঠকের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, যাতায়াত, নিরাপত্তা সহযোগিতা—সবকিছুতেই গভীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। ভারতীয় পক্ষ ভিসা সেবা ধাপে ধাপে পুরোপুরি চালু করার আশ্বাস দিয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা নতুন নয়। ২০১১ সালে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ‘কো-অর্ডিনেশন কনফারেন্স’ শুরু হয়, যাতে এসব ঘটনা কমানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অনেক সময় অভিযোগ ওঠে যে, মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হয় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সরাসরি বার্তা এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের সাড়া দেওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন সরকারের অধীনে এই ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।