গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর আজ দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে নতুন যাত্রা শুরু করছেন। প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের সদস্য নির্বাচিত করার পাশাপাশি একটি গণভোটে অংশ নিচ্ছেন। এই গণভোটে ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ না বিপক্ষে ‘না’—এই দুই বিকল্পে মতামত জানাবেন তাঁরা।

এটি শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই বিজয়ের পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে একদলীয় কর্তৃত্বের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।

দীর্ঘ আলোচনা-পরামর্শের মাধ্যমে গঠিত হয় ‘জুলাই সনদ’ বা জুলাই চার্টার, যা সংবিধান সংশোধনের একটি রূপরেখা। আজকের গণভোটে এই সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাবের ওপর জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনকে অনেকেই ‘সবচেয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে উদ্ভূত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিসহ অন্যান্য নতুন দলও মাঠে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলছে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে।

গণভোটের প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে—যেমন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ (সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ), নাগরিক পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’ করা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার নতুন বিধান। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে, যাতে ড. ইউনূস নিজে বলেছেন, এটি “নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দেবে”।

মূল তথ্যসমূহ:

– ভোটার সংখ্যা: প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ
– সংসদীয় আসন: ৩০০ (২৯৯টিতে ভোট)
– প্রার্থী সংখ্যা: প্রায় ১ হাজার ৯৮১ জন
– গণভোটের প্রশ্ন: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ না ‘না’
– সম্ভাব্য পরিবর্তন: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, দ্বিকক্ষ সংসদ, বিকেন্দ্রীকরণ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা
– প্রধান দল: বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী জোট, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঠিক আগের সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন তা শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নিতে এবং দেশে শান্তি ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে।

জাতীয় টেলিভিশন ও রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত এই ভাষণে সিইসি বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা, আর প্রতিযোগিতার পরিণতি হলো জয়-পরাজয়। এই জয়-পরাজয়কে সবাইকে মেনে নিতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র।” তিনি আরও যোগ করেন যে, কোনো দল বা প্রার্থীর জন্য ফলাফল অগ্রহণযোগ্য মনে হলেও আইনি পথে অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু রাস্তায় নেমে সহিংসতা বা অশান্তি সৃষ্টি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ভাষণে নাসির উদ্দিন স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত কয়েক বছরে দেশ একাধিক রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করার এই প্রথম বড় পরীক্ষা। তাই এই নির্বাচনকে শুধু ভোটের প্রতিযোগিতা নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আগামীকালের ভোটে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—একদিকে ৩০০ আসনের সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আলোকে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোট। এই দুটি প্রক্রিয়ার ফলাফল দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করবে। তাই ভোটারদের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সিইসি বলেন, “আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন কর্মকর্তা—সবাইকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আপনাদের—ভোটার, প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কোনো নির্বাচনই সফল হয় না।”

তিনি ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় শান্তিপূর্ণ আচরণ, কেন্দ্রের বাইরে অপ্রয়োজনীয় ভিড় না করা, কোনো ধরনের হুমকি বা প্রভাব বিস্তার না করা এবং ফলাফল ঘোষণার পরও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

নির্বাচনী আবহে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের বৈধতা নিয়ে নিজের দেওয়া বক্তব্য ভুলভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক জরুরি ব্রিফিংয়ে তিনি অভিযোগ করেন, তার বক্তব্যকে ‘মিসকোট’ করা হয়েছে, যা তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদাহানি ঘটিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কতিপয় সংবাদপত্রে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসি সচিব বলেছেন—বৈধ খাত দেখাতে পারলে নির্বাচনের আগে ৫ কোটি টাকা বহনেও কোনো আইনি বাধা নেই। এই মন্তব্য নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় উঠলে আজ কঠোর ভাষায় এর প্রতিবাদ জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বেশ কড়া সুরে বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার একটি বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুল প্রেক্ষাপটে এবং বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। ‘৫ কোটি টাকা বহন করলেও বাধা নেই’—এমন কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য আমি করিনি। এই ধরনের অপপ্রচার কেবল আমার জন্য অপমানজনক নয়, বরং পুরো নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চাই, আইন অনুযায়ী নগদ অর্থ বহনের নির্দিষ্ট সীমা এবং নিয়ম রয়েছে। আমি সেই নিয়মের বাইরে কোনো কথা বলিনি। অনুগ্রহ করে এই ধরনের সংবেদনশীল সময়ে কোনো ভিত্তিহীন অপতথ্য ছড়াবেন না।”

উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াত নেতার বিপুল অর্থসহ আটক হওয়া এবং দেশজুড়ে নির্বাচনী কালো টাকা ব্যবহারের আশঙ্কার মধ্যেই ইসি সচিবের পূর্ববর্তী একটি বক্তব্যের খণ্ডিতাংশ ভাইরাল হয়। সচিব জানান, তিনি মূলত বৈধ ব্যবসার লেনদেন এবং যথাযথ নথিপত্র থাকার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন। কিন্তু সেটিকে রাজনৈতিক মোড়ক দিয়ে ‘৫ কোটি টাকার ছাড়পত্র’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে এমন যেকোনো নগদ লেনদেন বা অর্থ পরিবহন নিষিদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিটি চেকপোস্টে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হলে দেশের সংসদীয় কাঠামোয় আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন—এককক্ষের পরিবর্তে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ গঠিত হবে, যার মধ্যে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ যুক্ত হবে। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের এই প্রস্তাব জনগণের সরাসরি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

একটি ভোটের মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—সংসদ সদস্য নির্বাচন এবং সংবিধান সংশোধনের ভবিষ্যৎ। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের হাতে এখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। গণভোটে দুটি ব্যালট পেপার থাকবে: একটি সাদা (সংসদ নির্বাচনের জন্য) এবং অন্যটি গোলাপি (গণভোটের জন্য)। গোলাপি ব্যালটে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বেছে নেবেন জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে।

জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি হয়। এতে স্বৈরাচার প্রতিরোধ, গণতন্ত্রের শক্তিশালীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো দ্বিকক্ষ সংসদ ব্যবস্থা চালু। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট। ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসন এবং ৫০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়ে এটি চলে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে এই কাঠামোয় যুক্ত হবে একটি উচ্চকক্ষ।

উচ্চকক্ষে থাকবে ১০০টি আসন। এগুলো সরাসরি নির্বাচিত হবে না। বরং সংসদ নির্বাচনে দলগুলো যে ভোট পাবে, তার আনুপাতিক হারে (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) আসন বণ্টন করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো দল ৩০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে উচ্চকক্ষে তারা পাবে ৩০টি আসন। এই ব্যবস্থা ছোট দলগুলোকেও প্রতিনিধিত্ব দেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—সংবিধান সংশোধনের জন্য নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লাগবে। ফলে একক দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা কমে আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

গণভোটের অন্যান্য প্রধান প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর (দুই মেয়াদ) সীমাবদ্ধ করা এবং নারীদের সংরক্ষিত আসন ধাপে ধাপে বাড়ানো। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য—ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহিমূলক করা।

নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি থাকতে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘সাজানো নাটক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় দাবি, এটি নির্বাচনের ঠিক আগে বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা।

আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “ঠাকুরগাঁও জেলা আমির একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। তাঁর কাছে থাকা অর্থ সম্পূর্ণভাবে ব্যবসায়িক। এয়ারপোর্টের মতো একটি উচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টিত জায়গায় যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ সিসিটিভি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত, সেখানে এ ধরনের নাটক সাজানো হাস্যকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

বুধবার দুপুরে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে প্রায় অর্ধকোটি (মতভেদে ৬০ থেকে ৭৪ লাখ) টাকাসহ বেলাল উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, নির্বাচনী মাঠে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের জন্য এই টাকা নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে জুবায়ের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “একজন শিক্ষক ও ব্যবসায়ীর কাছে টাকা থাকা কি অপরাধ? তিনি ঢাকা থেকে ব্যবসায়িক লেনদেন শেষে নিজ এলাকায় ফিরছিলেন। প্রশাসন একটি বিশেষ মহলের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে আসার পর বাইরে তাঁকে এভাবে আটক করা প্রমাণ করে যে, এটি আগে থেকেই তৈরি করা কোনো চিত্রনাট্যের অংশ। জুবায়েরের মতে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে জামায়াত ও সহযোগী দলগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতেই এই ‘টাকা উদ্ধারের গল্প’ সাজানো হয়েছে।

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। কাল সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হবে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট। দেশজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। প্রার্থীদের পোস্টার-ব্যানারে ঢাকা দেয়াল, ডিজিটাল স্ক্রিনে ঝলমলে প্রতিশ্রুতি, রাস্তায় রাস্তায় লিফলেট আর স্লোগান। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর এই নির্বাচনকে অনেকে বলছেন ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ গড়ার প্রথম সত্যিকারের পরীক্ষা।

১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি আসনে ভোট হবে (শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত)। সঙ্গে চলবে জুলাই চার্টারের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট। নির্বাচন কমিশন বলছে, মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ। প্রথমবারের মতো তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারও রয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন বদলে গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, জামায়াত-ই-ইসলামি, ছাত্র-জনতার নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ ৫১টি দলের ২০৩৪ জন প্রার্থী লড়ছেন। অনেক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীও শক্তিশালী।

এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের নয়, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারেরও। গণভোটে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবেন জুলাই চার্টারের প্রস্তাবিত সংস্কারে—যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংসদ, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগের বড় ধরনের পরিবর্তন।

আপনার ভোটকেন্দ্র কোথায়? জেনে নিন ঘরে বসেই ৪ সহজ উপায়ে

নির্বাচন কমিশন এবার ভোটারদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। চারটি পদ্ধতিতে মুহূর্তের মধ্যে জানা যাবে আপনার ভোটকেন্দ্র, ভোটার নম্বর ও সিরিয়াল।

১. স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বিডি অ্যাপ গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে ‘Smart Election Management BD’ ডাউনলোড করুন। ন্যাশনাল আইডি (১০ বা ১৭ ডিজিট) ও জন্মতারিখ দিন। দেখবেন আপনার ভোটার নম্বর, কেন্দ্রের নাম, ঠিকানা, ছবি, ম্যাপ, দূরত্ব—সবকিছু। জিপিএস দিয়ে নেভিগেশনও পাবেন।

২. ইসি ওয়েবসাইট ecs.gov.bd-এ যান। ‘Polling Station’ অপশনে NID, জন্মতারিখ ও ক্যাপচা দিন। তথ্য চলে আসবে।

৩. হটলাইন ১০৫-এ কল ১০৫ নম্বরে ফোন করুন। অপারেটর আপনার NID জিজ্ঞাসা করে তথ্য দেবেন।

৪. ১০৫-এ এসএমএস ‘PC’ স্পেস দিয়ে আপনার NID লিখে ১০৫-এ পাঠান। রিপ্লাইতে চলে আসবে ভোটার নম্বর ও কেন্দ্রের বিস্তারিত।

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বার্তা দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচন জিতে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে যথাসময়ে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়ন করা হবে—এমন প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই ঘোষণা আসে।

গত কয়েক মাস ধরে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশের আলোকে দ্রুত ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও গেজেট প্রকাশ ও কার্যকর করার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার। এই প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের বক্তব্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতির উদ্দেশে ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে সেবা ব্যবস্থায় স্থবিরতা তৈরি হয়। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে বেতন কাঠামো নিয়ে আর বিলম্ব করা হবে না; আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী ও সম্মানজনক পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।

নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের পর থেকেই সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধি, গ্রেড কাঠামোর সংস্কার এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণের দাবি তুলে আসছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান পে-স্কেলকে অনেকেই অপ্রতুল বলে মনে করছেন। ফলে পে-স্কেল প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই ঘোষণা নির্বাচনী অঙ্গনে বিএনপির কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভোটার হিসেবে একটি বড় অংশ; তাঁদের প্রত্যাশা ও অসন্তোষ নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা।

তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সতর্ক করে বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্বশীল সরকার হিসেবে বিএনপি আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেই কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি পূরণ করবে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক নজরদারি জোরদার হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস ইজাবসের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় রাজধানীর জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচনী পরিবেশ, ভোটগ্রহণের সুষ্ঠুতা ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। সাক্ষাৎটি সৌজন্য হলেও আলোচনার পরিধি ছিল বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ, যা নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ ও উদ্বেগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ইইউ প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য। তিনি রাজনৈতিক সহনশীলতা, সমান সুযোগ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা যায়, আলোচনায় নির্বাচনী আইন-কানুনের প্রয়োগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও কথা হয়। ইইউ পর্যবেক্ষক দলের সদস্যরা জানান, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে এসেছেন। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে একটি বাস্তবধর্মী ধারণা নেওয়া।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সক্রিয় পর্যবেক্ষণ—এই দুই বাস্তবতা মিলেই সাক্ষাৎটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইইউ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নে আগ্রহী অংশীদার হিসেবে পরিচিত।

জামায়াত নেতারা বৈঠকে দাবি করেন, সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত না হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন। ইইউ প্রতিনিধি দলও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের কথা উল্লেখ করে জানায়, তারা সব মত ও অবস্থান শুনে একটি সামগ্রিক মূল্যায়নে পৌঁছাতে চান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল করতে সারা দেশে যান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বুধবার মধ্যরাত ১২টা থেকে ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ থাকবে, যা ভোট গ্রহণের দিন বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছে ইসি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরও দীর্ঘ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাত ১২টা থেকে ভোট গ্রহণের পরদিন শুক্রবার মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদিত স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেল এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী সহিংসতা, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে প্রতিবারের মতো এবারও পরিবহন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগের রাত ও ভোটের দিন যানবাহনের অবাধ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কিছু এলাকায় অবৈধভাবে ভোটার পরিবহন, অস্ত্র বা অবৈধ সামগ্রী বহনের অভিযোগ ওঠে। এসব আশঙ্কা থেকেই এই কড়াকড়ি।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া যানবাহনের মধ্যে রয়েছে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী উভয় ধরনের গাড়ি। ফলে দূরপাল্লার যাত্রা, পণ্য পরিবহন এবং শহরাঞ্চলে দৈনন্দিন চলাচলে সাময়িক ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, এই সাময়িক অসুবিধাই নির্বাচনকে নির্বিঘ্ন করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনী সহিংসতা বা হঠাৎ বিশৃঙ্খলার ঘটনায় মোটরসাইকেল দ্রুত চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিন দিনের এই নিষেধাজ্ঞা ভোটের আগে ও পরে নিরাপত্তা বলয়কে শক্তিশালী করবে।

এদিকে জরুরি সেবার ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। ইসি সূত্র জানায়, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ ও জরুরি সরকারি কাজে নিয়োজিত যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনপ্রাপ্ত ও স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেল চলাচলেও বাধা নেই, যা মূলত নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে ব্যবহৃত হবে।

 

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বড় অগ্রগতি এসেছে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারদের জন্য পাঠানো ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৫৭টি পোস্টাল ব্যালট ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে বলে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন বিষয়ক ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রবাসী নাগরিকদের অংশগ্রহণমূলক ভোটাধিকার বাস্তবায়নের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলবে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। দেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেওয়ার বাস্তব সীমাবদ্ধতা, দূরত্ব ও সময়ের জটিলতা—সব মিলিয়ে প্রবাসী নাগরিকদের কণ্ঠ কার্যত অনুপস্থিত ছিল জাতীয় নির্বাচনে। সেই প্রেক্ষাপটে ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করাকে নীতিনির্ধারকেরা দেখছেন একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে।

‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত প্রবাসীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট পূরণ করে ডাকযোগে পাঠিয়েছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই শেষে দেশে এনে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ব্যালটের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সঠিক গণনা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের এই অংশগ্রহণ কেবল ভোটের সংখ্যা বাড়াবে না, বরং রাজনৈতিক বৈধতা ও গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বড় ভূমিকা রাখলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের অংশগ্রহণ এতদিন সীমিত ছিল। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা সেই ব্যবধান কমাতে পারে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ডাকব্যবস্থার সময়ানুবর্তিতা, ব্যালট পৌঁছানো ও ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া, এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা—এই তিনটি ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটিও বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা। এ কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।