আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতিতে সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র ও গাড়ির স্টিকার প্রদানে অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু সাংবাদিকদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে গত বৃহস্পতিবার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ইসি। তার আগেই প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক অনলাইনে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ইসির ওয়েবসাইট থেকে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এই ঘটনা সাংবাদিক সমাজে বড় ধাক্কা দিয়েছে। নির্বাচন কভারেজের জন্য প্রথমবারের মতো চালু করা অনলাইন পদ্ধতি সুবিধাজনক হওয়ার কথা থাকলেও, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এটি উল্টো বিপদ ডেকে এনেছে। শনিবার বিকেলে ইসির নির্ধারিত ওয়েবসাইটে (pr.ecs.gov.bd) ১৪ হাজারেরও বেশি সাংবাদিকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, নাম, মোবাইল নম্বর, ইমেইলসহ সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসে। এই তথ্য যেকোনো মুহূর্তে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার জন্য গুরুতর হুমকি।

প্রেক্ষাপটে ফিরে যাই। নির্বাচন কমিশন জানুয়ারির শুরুতে ঘোষণা করে যে, এবার সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কার্ড পেতে সশরীরে আবেদনের পরিবর্তে অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে। এতে সময় বাঁচবে, কাগজপত্র কমবে এবং অনুমোদিত কার্ড ঘরে বসে ডাউনলোড করা যাবে—এমনই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। অনেক সাংবাদিক অভিযোগ করেন, এনআইডি নম্বর, ইমেইল, মোবাইল দিয়ে লগইন করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে, আবেদন জমা পড়ছে না। ফলে নির্বাচন কভার করার সময়সীমা সংকুচিত হয়ে আসায় অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

সাংবাদিক নেতারা ইসির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলোচনার পর ইসি সিদ্ধান্ত নেয় যে, অনলাইন বাধ্যতামূলকতা তুলে নেওয়া হবে। যারা ইতিমধ্যে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদন বিবেচনা করা হবে; বাকিরা সশরীরে নির্বাচন ভবনে এসে ম্যানুয়ালি কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। ইসি সচিব জানান, এই পরিবর্তন শিগগিরই কার্যকর হবে।

কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ হয়নি। অনলাইন আবেদনের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ইসির ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। সাংবাদিকরা বলছেন, এ ধরনের তথ্য ফাঁস হলে পরিচয় চুরি, হয়রানি বা এমনকি রাজনৈতিক চাপের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর সময়ে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশ্ববাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দামে যে পাগলাঘোড়া দৌড় দেখা গিয়েছিল, তাতে হঠাৎ লাগাম পড়েছে। ২৬ জানুয়ারি ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখর ৫,৫০০ ডলার স্পর্শ করার পর, কয়েক দিনের ব্যবধানেই মূল্যবান এই ধাতুর দামে বড় ধরনের পতন শুরু হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অস্থিরতা যখন তুঙ্গে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজার বা মুদ্রার চেয়ে ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে সোনার দিকেই বেশি ঝোঁকেন। সাম্প্রতিক সময়ে বড় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধাবস্থার কারণে সোনার চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছিল।

গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিশ্ব অর্থনীতি এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়। প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫,০০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে এক পর্যায়ে তা ৫,৫০০ ডলারে গিয়ে ঠেকে। শুধু সোনাই নয়, রুপা এবং প্লাটিনামের বাজারেও এর ঢেউ লাগে। সাধারণ মানুষ যখন ভাবছিলেন সোনা কেনা হয়তো সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখনই দৃশ্যপট বদলে যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দরপতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যখন কোনো সম্পদের দাম অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়ে, তখন বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের মুনাফা তুলে নিতে (Profit Taking) বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দেন।

৫,৫০০ ডলারে পৌঁছানোর পর বড় ফাণ্ডগুলো সোনা বিক্রি শুরু করে, যা বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দেয় এবং দাম কমিয়ে দেয় বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নিয়ে নতুন কোনো ইঙ্গিত দিলে বিনিয়োগকারীরা সোনা ছেড়ে বন্ড বা ডলারের দিকে ফেরেন। বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা কিছুটা কমার সামান্য ইঙ্গিত পেলেও নিরাপদ বিনিয়োগ থেকে সরে আসে পুঁজি।

এক নজরে বাজারের পরিস্থিতি

  • সর্বোচ্চ রেকর্ড: প্রতি আউন্স ৫,৫০০ মার্কিন ডলার (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬)।
  • অন্যান্য ধাতু: রুপা ও প্লাটিনামের দামও ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত উঠানামা করেছে।
  • তুলনামূলক চিত্র: বর্তমান দাম গত সপ্তাহের চেয়ে কম হলেও, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় তা এখনো প্রায় ২০% বেশি।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পতন সাময়িক হতে পারে। যদিও দাম ৫,৫০০ ডলার থেকে নিচে নেমে এসেছে, তবুও বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য সোনা এখনো সেরা পছন্দ হিসেবেই রয়ে গেছে।

একজন সিনিয়র মার্কেট এনালিস্টের ভাষায়, “সোনা এখন একটি জংশনে দাঁড়িয়ে আছে। যদি ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়, তবে ৫,০০০ ডলারের ঘরটি খুব দ্রুতই আবার ফিরে আসবে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই সাময়িক দরপতন গয়না কেনার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর থেকে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। এ সময়ে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডসহ মোট চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুসারে, ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় ১৪৪টি সহিংস ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

এই সহিংসতার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫৫টি। সবচেয়ে উত্তপ্ত অবস্থা কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর জেলায়—যেখানে চার দফা করে সংঘর্ষ হয়েছে। এই দুই জেলায় প্রার্থীদের সমর্থকরা একে অপরের ওপর হামলা, গুলি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় জড়িয়েছে। অন্যান্য জেলাগুলোর তুলনায় এখানে সহিংসতার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।

তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধিপত্যের লড়াই তীব্র হয়েছে। শেরপুরে প্রার্থীদের ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষে জামায়াতের শ্রীবর্দী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন। এছাড়া অন্যান্য হত্যাকাণ্ডে প্রার্থী বা তাদের ঘনিষ্ঠ সমর্থকরা লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বারবার সতর্ক করলেও মাঠপর্যায়ে সহিংসতা কমেনি। অনেকে মনে করছেন, জুলাই বিপ্লবের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব ও পুরনো শত্রুতা এই অস্থিরতার মূল কারণ। কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরের মতো এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বও সংঘর্ষকে উস্কে দিচ্ছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সহিংসতা রোধে কঠোর নজরদারি চলছে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ নামে ৩৬ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই দলের ইশতেহারে তরুণদের ক্ষমতায়ন, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, সুশাসন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এই ঘোষণা নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক মূলধারায় তুলে ধরার প্রয়াস।

এনসিপি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের হাত ধরে। এখন তারা ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যে (জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন) যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু দলটি স্পষ্ট করে বলেছে, জোটের সঙ্গে থেকেও নিজস্ব সংস্কারের এজেন্ডা থেকে সরে আসবে না। ইশতেহারটি ১২টি বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ে বিভক্ত, যার মধ্যে ৩৬টি দফাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, সত্যান্বেষণ ও সমঝোতা কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইশতেহারে বাস্তবমুখী প্রতিশ্রুতি চোখে পড়ার মতো। পাঁচ বছরে ১ কোটি মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ১০০ বিলিয়ন টাকার উদ্যোক্তা তহবিল গঠন, ঘণ্টায় ১০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা বীমা ও পেনশন স্কিম চালু, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করা—এসব প্রতিশ্রুতি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনমান উন্নয়নে ফোকাস করে। এছাড়া নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া, এসএমই ও নারী-তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নগদপ্রবাহভিত্তিক ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও নারী ক্ষমতায়নে ইশতেহারে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানে ৬ মাসের পূর্ণ বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং ১ মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করা, নারীদের জন্য ১০০টি সরাসরি নির্বাচিত আসন নিশ্চিত করা, একটি কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের সব সুবিধা প্রদান—এগুলো সমাজের দুর্বল অংশকে মূলধারায় আনার প্রতিশ্রুতি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, কৃষিতে সরাসরি ভর্তুকি, ন্যায্য পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রেও বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের সামনে কোনো নতুন চ্যালেঞ্জ নেই। গতানুগতিক দায়িত্ব পালন করে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানই প্রধান কাজ। দীর্ঘ খরার পর ইনশাআল্লাহ সেই পথেই আমরা এগোচ্ছি। শুক্রবার বিকেল ৪টায় পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল ও ভিজিল্যান্স অবজারভেশন টিমের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই দিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটের প্রস্তুতি নিয়ে এই সভা হয়। কমিশনার সানাউল্লাহ জানান, নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ ভালো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু কোথাও অস্থিরতা বা সহিংসতার সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে সামান্যতম ছাড় দেওয়া হবে না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সভায় গণভোটের আচরণবিধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কমিশনার জানান, সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটের আচরণবিধি একই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণকে গণভোট সম্পর্কে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন, কিন্তু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে কোনো অবস্থান নিতে পারবেন না। এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ভোট গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা যদি পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

পটুয়াখালীতে চারটি আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোটার উপস্থিতির লক্ষ্যে কাজ চলছে। নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভিজিল্যান্স টিম ও পর্যবেক্ষকদের সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।

দীর্ঘদিনের নির্বাচনী ‘খরা’র কথা উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, অতীতে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার অভাবে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এবার সেই ক্ষত সারাতে কমিশন বদ্ধপরিকর। নির্বাচন কমিশন বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পক্ষপাতমূলক নির্দেশনা দেওয়া হবে না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে বলেছেন, ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যে যোগ দিলেও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের লড়াই চলমান থাকবে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ নামে ৩৬ দফার এই দলিলে তারুণ্যের শক্তিকে কেন্দ্র করে একটি বৈষম্যমুক্ত, সুশাসিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেন, জোট গঠনের পরও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে এনসিপির সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা কি ফিকে হয়ে গেছে? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এটা কেবল নির্বাচনি জোট, রাজনৈতিক আত্মসমর্পণ নয়। আমরা এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই সংস্কারের দাবিগুলোকে এগিয়ে নেব। নতুন বন্দোবস্তের লড়াই দীর্ঘমেয়াদি, এক নির্বাচনে শেষ হবে না।” এনসিপি জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে গড়ে ওঠা দল হিসেবে বিগত আমলের ক্ষত মুছে ফেলে নতুন প্রজন্মের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে চায়।

দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “আমরা ইশতেহার দিয়ে প্রতারণা করতে আসিনি। বাস্তবায়ন না করার সংস্কৃতিতে আমরা ঢুকব না।” ইশতেহারে ১২টি অধ্যায়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে—রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী ক্ষমতায়ন, প্রবাসী কল্যাণ থেকে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত। বিশেষ করে তরুণদের জন্য ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ১০০ বিলিয়ন টাকার উদ্যোক্তা তহবিল, ভোটাধিকার ১৬ বছরে নামানো, চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধসহ বেশ কিছু বাস্তবমুখী প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

এনসিপি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয়েছে, জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের হাত ধরে। পরে নির্বাচন কমিশন থেকে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক পেয়ে নিবন্ধিত হয়। দলটি ১১ দলীয় ঐক্যে (সমমনা ১১ দল বা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ) যোগ দিয়ে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই জোটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল রয়েছে। নাহিদ ইসলামের ভাষায়, “এটা ঐতিহাসিক যাত্রা, কিন্তু আমাদের লড়াইয়ের গন্তব্য নতুন প্রজাতন্ত্র।”

ইশতেহার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এনসিপি নিজেকে একটি তারুণ্যনির্ভর, সংস্কারমুখী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। দলের নেতারা বলছেন, বিগত দশকের দুর্নীতি, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের ক্ষত থেকে উত্তরণের জন্য এই দলিল একটি রোডম্যাপ। নাহিদ বলেন, “এটা গদি দখলের দলিল নয়, মর্যাদার অধিকার আদায়ের ইশতেহার।”

ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভা প্রদেশে প্রবল বর্ষণের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ ভূমিধসের এক সপ্তাহ পার হয়েছে, কিন্তু এখনও ২৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। গত ২৪ জানুয়ারি শনিবার সকালে বান্দুং বারাত জেলার পাসির লাঙ্গু গ্রামে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা বৃষ্টির মধ্যেও অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু আবহাওয়া তাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে পশ্চিম জাভার পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে দিনের পর দিন প্রবল বর্ষণ মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি শনিবার ভোরে ভূমিধসের রূপ নেয়। পাসির লাঙ্গু গ্রামের পাশাপাশি সিসারুয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্ঘটনায় কয়েকটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, এবং একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ান নৌবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, মৃতদের মধ্যে অন্তত ২৩ জন সৈনিক রয়েছেন, যারা প্রশিক্ষণের সময় ধসের কবলে পড়েন।

উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিএনপিবি, বাসারনাস এবং সামরিক বাহিনী। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনুসন্ধান চালানোর জন্য ভারী যন্ত্রপাতি এবং কুকুরের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অবিরাম বৃষ্টি উদ্ধারকারীদের কাজকে কঠিন করে তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রিনা সুতান্তো বলেন, “আমাদের গ্রামটা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু চলে গেছে, শুধু কাদা আর ধ্বংসাবশেষ।” ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬৮৫ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের স্থানীয় সরকারি ভবনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

ভূমিধসের পাশাপাশি পশ্চিম জাভার বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। নদীগুলোর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাজধানী জাকার্তাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যা শহরের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। আবহাওয়া সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, লা নিনা এবং মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই প্রবল বর্ষণ ঘটছে, যা আগামী সপ্তাহেও চলতে পারে। এর ফলে জাকার্তা এবং আশপাশের এলাকায় ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক ফ্রম হোম নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

পশ্চিম জাভার গভর্নর দেদি মুলিয়াদি এই দুর্যোগের জন্য পাহাড়ি এলাকায় বিস্তৃত চাষাবাদকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “পাহাড়ের চারপাশে অতিরিক্ত চাষাবাদ মাটির ক্ষয় বাড়িয়েছে, যা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।” ইন্দোনেশিয়া, যা প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অফ ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত, প্রায়ই ভূমিকম্প, জ্বালামুখী অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূমিধসের মুখোমুখি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, টানা ১৭ বছর দেশে থাকতে না পারলেও দেশের উন্নয়ন থেমে ছিল—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে বিএনপি ক্ষমতায় এলে পালিয়ে যাওয়ার রাজনীতি করবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে নওগাঁ শহরের এটিম মাঠে এক জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি।

নওগাঁ জেলা বিএনপি আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, উন্নয়ন বিতর্ক এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিয়ে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি ক্ষমতায় গেলে দলের অবস্থান কী হবে—তারও ইঙ্গিত। তিনি বলেন, “আমি দেশে ১৭ বছর থাকতে পারিনি। তাহলে এত বছর দেশের উন্নয়ন কি হয়নি? যেখানে যাই, সবাই বিভিন্ন বিষয়ে আবদার করে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, ব্যক্তি উপস্থিতি ছাড়াও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম চলমান থাকে এবং উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর ভাষায়, জনগণের সঙ্গে দলের সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকলেও দেশের মানুষ বিএনপিকে ভুলে যায়নি, বরং বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রত্যাশা ও দাবির কথা তুলে ধরেছে। এ থেকেই বোঝা যায়, বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি এখনো দৃঢ়।

সমাবেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ ছিল তাঁর ‘পালিয়ে যাওয়া’ প্রসঙ্গ। সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “হুট করে প্লেনে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের নাই। আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নাই।” এই বক্তব্যকে অনেকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, যেখানে ক্ষমতা হারালে দেশ ছাড়ার অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কে বারবার উঠে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। উন্নয়নকে তিনি কেবল অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ন্যায্যতার সঙ্গে যুক্ত করেন। তারেক রহমানের মতে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরি হয়।

সমাবেশে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলে ন্যায্যমূল্য, সেচব্যবস্থা ও কৃষক সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই বক্তব্য নির্বাচনের আগে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করার কৌশলের অংশ। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার প্রসঙ্গকে তিনি দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। একই সঙ্গে ‘পালিয়ে যাওয়ার’ প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে তিনি দলীয় কর্মীদের মধ্যে আস্থার বার্তা দিতে চেয়েছেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা ও অনিয়ম ঠেকাতে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কোথাও ব্যালট বক্স ছিনতাই হলে দায় এড়াতে পারবেন না সংশ্লিষ্ট কেউই।

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে যখন নানা আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য নির্বাচনী প্রশাসনের কড়াকড়ি অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি জানান, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। বিশেষ করে ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু দুষ্কৃতকারীরাই নয়, দায়িত্বে অবহেলাকারীরাও জবাবদিহির আওতায় আসবেন। তাঁর ভাষায়, “কোনো জায়গায় যদি কোনো বাকসো ছিনতাই হয়, তাহলে ওই পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রিসাইডিং অফিসার কিংবা দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউই রেহাই পাবে না।”

নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, ব্যালট বক্স ছিনতাই ও ভোটকেন্দ্র দখল—এই দুই বিষয় ভোটের গ্রহণযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার আগেভাগে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে এমন স্পষ্ট বার্তা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে, যাতে আগাম সহিংসতার আশঙ্কা শনাক্ত করা যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এই ধরনের “জিরো টলারেন্স” বার্তা দায়িত্ব পালনে মনোযোগ বাড়াবে। একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই—এমন বার্তা মাঠে কাজ করা সদস্যদের আরও সতর্ক করে তুলবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও কঠোরতা—দুটোই সমান জরুরি। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে শুধু ভোটের দিন নয়, তার আগের ও পরের সময়ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য সেই ধারাবাহিক প্রস্তুতিরই অংশ।

আসন্ন গণভোটে নিরপেক্ষতা ও আস্থার পরিবেশ বজায় রাখতে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—কোনো পক্ষের প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না বলে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ইসির উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন এ নির্দেশনা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান।

গণভোটকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই নির্বাচন কমিশনের এই সতর্ক অবস্থান। ইসি মনে করছে, ভোটগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের আচরণ ও ভূমিকা সরাসরি ভোটারদের আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে তাঁদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা মতামতভিত্তিক প্রচারণা গণভোটের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী গণভোটের প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ, গণনা বা সংশ্লিষ্ট যেকোনো দায়িত্বে থাকবেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কোনো প্ল্যাটফর্মে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে মতামত প্রকাশ করতে পারবেন না। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়েও প্রচারণামূলক কার্যক্রমে জড়ানো যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে সরকারি কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত মতামত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সে কারণেই এবার আগেভাগে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—তাঁদের অধীনস্থ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই নির্দেশনা সম্পর্কে অবহিত করা এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণভোট একটি সংবেদনশীল ও মতভিত্তিক প্রক্রিয়া। এখানে প্রশাসনের সামান্য পক্ষপাতের ধারণাও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক বলেন, “ভোটের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা যদি প্রকাশ্যে কোনো পক্ষের সমর্থন দেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইসির এই নির্দেশনা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক।”

গণভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তীব্র। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা রক্ষা করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইসি মনে করছে, স্পষ্ট নিয়ম ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।