আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী আইনগতভাবে কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করতে পারবেন না। যারা এই নির্দেশনা অমান্য করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম এদিন জোর দিয়ে বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “নির্বাচনি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রিজাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রত্যেক স্তরের কর্মকর্তা এখন থেকে নির্বাচন কমিশনের অধীন। তাদের প্রধান এবং একমাত্র পরিচয় হবে তারা ‘নিরপেক্ষ’। কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।”

ইসি আরও জানান, নির্বাচনি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তাকে শপথ মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদি কারও বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাকে কেবল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই হবে না, বরং বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে। আজকের ব্রিফিংয়ে আনোয়ারুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং দৃঢ়তা—এই তিনটি গুণ ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা চাই না অতীতের মতো কোনো বিতর্কিত নির্বাচন হোক। জনগণ যাতে নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।”

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্রিটেনের দারিদ্র্যের ভয়াবহ চিত্র। জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশনের (জেআরএফ) ‘ইউকে পভার্টি ২০২৬’ রিপোর্ট অনুসারে, দেশটিতে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ এখন ‘অত্যন্ত গভীর দারিদ্র্যে’ নিমজ্জিত, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই সংকটের কারণে লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই প্রতিবেদনটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা দেখাচ্ছে যে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার সামান্য কমলেও—১৯৯৪-৯৫ সালের ২৪ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে—গভীরতর দারিদ্র্যের পরিধি বেড়েছে। ‘অত্যন্ত গভীর দারিদ্র্য’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন পরিবারগুলোকে, যাদের বাসাভাড়া বাদ দেওয়ার পরও আয় যুক্তরাজ্যের মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশের নিচে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, দুটি ছোট সন্তানসহ একটি দম্পতির ক্ষেত্রে এই আয় বছরে মাত্র ১৬ হাজার ৪০০ পাউন্ডের মতো। এই স্তরে থাকা মানুষেরা খাদ্য, জ্বালানি এবং পোশাকের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খান।

প্রতিবেদনটি আরও জানিয়েছে যে দারিদ্র্যের গভীরতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গড় দরিদ্র ব্যক্তির আয় দারিদ্র্যসীমার ২৮ শতাংশ নিচে। এটি ১৯৯৪-৯৫ সালের ২৩ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে কস্ট অফ লিভিং সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নীতির অপর্যাপ্ততা। গত কয়েক বছরে জ্বালানি দামের উর্ধ্বগতি এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে দুর্বল গোষ্ঠীগুলোকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। জেআরএফের প্রধান বিশ্লেষক পিটার মাতেজিক বলেছেন, “দারিদ্র্য এখন শুধু বিস্তৃত নয়, এটি গত ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর রূপ নিয়েছে।”

এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিশু এবং কর্মক্ষম বয়সের প্রাপ্তবয়স্কদের উপর। প্রতিবেদন অনুসারে, ৪৫ লাখ শিশু দারিদ্র্যে বাস করছে, যা টানা তৃতীয় বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, ৮১ লাখ কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক এবং ২১ লাখ পেনশনারও এই চক্রে আটকে পড়েছেন। লন্ডন, ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস এবং য়র্কশায়ারের মতো অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে উচ্চ, যেখানে হাউজিং খরচের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল। স্কটল্যান্ডে দারিদ্র্যের হার যুক্তরাজ্যের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (২০ শতাংশ), কিন্তু সেখানেও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই প্রবণতা অর্থনৈতিক অসমতার একটি স্পষ্ট চিহ্ন। যেখানে ধনীদের আয় বাড়ছে, সেখানে দরিদ্ররা আরও পিছিয়ে পড়ছে। সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা যেমন ইউনিভার্সাল ক্রেডিট এবং চাইল্ড বেনিফিটের সংস্কার না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। রক্ষণশীল সরকারের শেষ মেয়াদে দারিদ্র্যের গভীরতা বেড়েছে, যা নতুন লেবার সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ভূমিকাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। এই নির্দেশনা দেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করার প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এই নির্দেশ দেন। সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই বৈঠকে তিনি বলেন, “এই নির্বাচন শুধু একটি ভোটগ্রহণ নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। জনগণের ভোটাধিকার যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সশস্ত্র বাহিনীকে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।”

জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু সংসদ নির্বাচনই নয়, জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকে ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের জন্য মানদণ্ড হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, নির্বাচনী পরিবেশে কোনো ধরনের ভয় বা শঙ্কা থাকবে না—এটি হবে উৎসবের মতো।

সশস্ত্র বাহিনী ইতিমধ্যে নির্বাচনী নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে তারা ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু এবারের নির্দেশে নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে সশস্ত্র বাহিনীর এই নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য।

অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর দেশে সংস্কারের ঢেউ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও কিছু দলের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীলতা নির্বাচনের সাফল্যের চাবিকাঠি হয়ে উঠতে পারে।

দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও গতিশীল করতে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিডা, বেজা ও বেপজাসহ বিনিয়োগের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছয়টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের কথা জানানো হয়।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়নের পথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দীর্ঘদিনের এক বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। সেই জড়তা কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বা একক সেবা নিশ্চিত করতেই এই একীভূতকরণের উদ্যোগ। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বিন হারুন জানান, বিনিয়োগের প্রবাহ সহজতর করতে এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনে এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

প্রেস সচিব শফিকুল আলমের উপস্থিতিতে এই সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন থেকে ভিন্ন ভিন্ন দরজায় না ঘুরে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই সব ধরণের প্রশাসনিক ও কারিগরি সুবিধা পাবেন। মূলত প্রশাসনিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশকে একটি ‘বিজনেস ফ্রেন্ডলি’ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করাই এই মহোদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

সরকারের এই নতুন কাঠামোর আওতায় মোট ছয়টি সংস্থা তাদের স্বকীয় পরিচয় ছাপিয়ে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে কাজ করবে। এগুলো হলো: ১. বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ২. বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ৩. বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ৪. বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ৫. পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ ৬. বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)

চৌধুরী আশিক বিন হারুন উল্লেখ করেন, অতীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটত এবং সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হতো। এখন থেকে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সেই সময় এবং শ্রম—উভয়ই সাশ্রয় হবে।

দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে ‘নৌকা’ অদৃশ্য হয়ে গেছে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বেগুনবাড়ি ইউনিয়নে এক নির্বাচনি গণসংযোগে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁও। সোমবার দুপুরে বেগুনবাড়ি বিডি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমসাময়িক রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি বলেন, অতীতে ভোটের লড়াই ছিল মূলত ‘নৌকা’ আর ‘ধানের শীষে’র মধ্যে। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। মাঠ থেকে নৌকার কোনো চিহ্ন নেই, কারণ তাদের প্রধান নেত্রীই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।

ফখরুল অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা কেবল ক্ষমতা হারাননি, বরং তার দলের তৃণমূলের কর্মীদের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নৌকার কাণ্ডারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপনাদের ফেলে ভারতে চলে গেছেন, এখন দিল্লিতে বসে আছেন। তিনি থাকলে অন্তত দেশে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার সুযোগ থাকতো, কিন্তু তিনি সেই দায়িত্ব পালন না করে পালিয়ে যাওয়াকেই বেছে নিয়েছেন।”

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিএনপি মহাসচিব বেশ আক্ষেপের সুরে বলেন, শেখ হাসিনার এই চলে যাওয়া তাদের দল বা জোটকে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে। তিনি মনে করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে অবস্থান করাটা একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পলায়নপর এই রাজনীতি সাধারণ মানুষ ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য কেবল বিপদই ডেকে এনেছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কথা স্মরণ করে ফখরুল বলেন, “আমরা লড়াই করছি দেশের মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। আর যারা ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করত, তারা আজ দেশান্তরী।

সোমবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা প্রশ্ন তুলেছেন—সন্তানের খুনের ভিডিও ফুটেজ স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন পুলিশ সদস্যের মাত্র তিন বছরের সাজা যৌক্তিক হতে পারে? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে ছয়জনের হত্যাকাণ্ডের মামলায় এই রায়ের পর শোকাহত পরিবারের এই ক্ষোভ জাতীয় বিচারপ্রক্রিয়ার গভীরতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে আনাসের মা বলেন, “আমার ছেলের শেষ মুহূর্তের ভিডিও সবাই দেখেছে। গুলি চালানোর মুহূর্ত, রক্তাক্ত রাস্তা—সবকিছু সামনে। তবু যারা গুলি চালিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মাত্র তিন-চার বছরের সাজা। এটা কীভাবে আমার সন্তানের জীবনের দাম হয়?” তাঁর কণ্ঠে কান্না মিশে গেলেও প্রশ্ন ছিল স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ—যেন গোটা জাতির অব্যক্ত ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।

এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, যা অনেকের কাছে ন্যায়ের এক ধাপ এগোনো। কিন্তু নিচুতলার কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের সাজা নিয়ে পরিবারগুলোর মনে অসন্তোষ। প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা সরাসরি গুলি চালিয়েছে, এবং সিসিটিভি ও মোবাইল ফুটেজে তা প্রমাণিত। তবু তিন কনস্টেবল—সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল—প্রত্যেককে মাত্র তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক আরশাদ হোসেন চার বছর পেয়েছেন। এই সাজাগুলোকে অনেকে ‘হালকা’ বলে মনে করছেন, বিশেষ করে যখন মামলাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অধীনে বিচার হয়েছে।

পটভূমিতে ফিরে যাই। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের চরম মুহূর্তে, ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক প্রাণ হারান। এই ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মামলা গঠন হয়, তদন্ত শেষ হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়। ট্রাইব্যুনালে ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়, যার মধ্যে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। আনাসের মা নিজেও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি অভিযুক্তদের ফাঁসির দাবি জানিয়েছিলেন।

রায়ের পর আনাসের বাবা সাহরিয়ার খানও বলেন, “উচ্চপদস্থদের সাজা দেখে কিছুটা স্বস্তি হয়েছে, কিন্তু যারা সরাসরি ট্রিগার টেনেছে, তাদের এত হালকা সাজা মেনে নেওয়া কঠিন।” পরিবারগুলোর এই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বিচারের পথে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়ের অনুভূতি পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজধানীর চানখাঁরপুলে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে। সোমবার এই রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল, যা দেশের ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়মুক্তির যুগের অবসানের সংকেত দিচ্ছে।

এই ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত হয়, যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল দেশ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, চানখাঁরপুল এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের অত্যধিক বলপ্রয়োগের ফলে ছয়জনের মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে মামলা দায়ের হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়েছে, আসামিরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে অপরাধ সংঘটিত করেছেন।

মামলার বিবরণে উঠে এসেছে যে, হাবিবুর রহমান তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সরাসরি দায়িত্বশীল ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এই তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাঁদের সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া, অন্য আসামিদের মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এই মামলায় মোট আটজন আসামি ছিলেন, যাদের মধ্যে চারজন—হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল এবং ইমরুল—পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। বাকিরা কারাগারে থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছিলেন। প্রসিকিউশন ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপন করেছে, যার মধ্যে শহীদ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খানের সাক্ষ্য ছিল সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী। আসামিপক্ষও সাক্ষী উপস্থাপন করলেও, ট্রাইব্যুনাল প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এটি দ্বিতীয় রায়। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যখন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হয়ে পাঁচ বছরের সাজা পান। এই রায়গুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্দোলনের সময়কার সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের প্রক্রিয়া গতি পাচ্ছে। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন রায়গুলো দেশে ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে, কিন্তু পলাতক আসামিদের ধরা এবং সাজা কার্যকর করা চ্যালেঞ্জিং হবে।

এই ঘটনার পটভূমিতে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে স্মরণ করা যায়, যা কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই সময় পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর হাতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। চানখাঁরপুলের ঘটনা ছিল তারই একটি করুণ অধ্যায়, যেখানে নিরস্ত্র যুবকরা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। শহীদদের পরিবারগুলো এখনও সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন, এবং এই রায় তাঁদের জন্য সান্ত্বনা হলেও, পূর্ণ ন্যায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন।

ভোটের অধিকার নিশ্চিত ও সুরক্ষিত রাখতে ভোটের দিন ভোর থেকেই ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়তে হবে এবং সেখান থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রস্তুত থাকতে হবে—যাতে কোনোভাবেই ভোটের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনকে ঘিরে নানা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই আহ্বান এসেছে। তারেক রহমান মনে করেন, ভোটারদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থানই ভোটের পরিবেশ রক্ষার অন্যতম উপায়। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় অনুশাসন ও নাগরিক কর্তব্যের সমন্বয় ঘটিয়ে ভোটারদের মনোবল জোরদার করার বার্তাও রয়েছে।

বিএনপির এক ভার্চুয়াল সভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ভোটাধিকার কোনো দলের অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় ভোটের দিন শুরু থেকেই সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণ আচরণ বজায় রাখার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার নির্দেশনাও দেন, যাতে ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোর থেকে ভোটকেন্দ্রে অবস্থান নেওয়ার এই কৌশল একদিকে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর বার্তা দেয়, অন্যদিকে দলীয় কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ জোরদার করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটার অনুপস্থিতি কিংবা ভোটগ্রহণে বিলম্বের অভিযোগ উঠে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিএনপি এবার ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

তারেক রহমানের বক্তব্যে ধর্মীয় অনুষঙ্গ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি সামাজিকভাবেও আলোচনা তৈরি করেছে। সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, ধর্মীয় আবহে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির আহ্বান ভোটারদের মানসিক প্রস্তুতি ও নৈতিক শক্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ভোট একটি সম্পূর্ণ নাগরিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া; সেখানে ধর্মীয় আহ্বানের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বিএনপির নেতারা অবশ্য বলছেন, এখানে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং শৃঙ্খলা, শান্তিপূর্ণ অবস্থান এবং ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “ভোর থেকে কেন্দ্রের সামনে থাকলে যেমন ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, তেমনি কোনো অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করা সহজ হয়।”

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশন বারবার ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের বার্তা নির্বাচন পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আসন্ন পবিত্র রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সরবরাহ সংকট নেই—বরং গত বছরের তুলনায় আমদানি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে রোজার বাজারে দাম গত বছরের চেয়ে কম থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন। এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে, যখন মুদ্রাস্ফীতির চাপে অনেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টা আজ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, রমজানের প্রধান পণ্যগুলোর আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খেজুর, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চিনি—এসবের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকবে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণও বেশি, যা সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করছে।

এই বছর সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, খেজুর আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের খরচ কমেছে, যার সুবিধা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, “সরবরাহকেন্দ্রিক কোনো জটিলতা না থাকলে দাম আরও কমার সুযোগ আছে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এবারের রমজান গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি আরামদায়ক হবে।

তবে বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, শুধু আমদানি বাড়লেই হবে না—বাজারে সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতা রোধ করা জরুরি। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, রমজান শুরুর আগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মজুত করে দাম বাড়িয়ে দেন। সরকার এবার ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে খোলা বাজারে সাশ্রয়ী দামে পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা করছে। এছাড়া, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।

রমজানের বাজার নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • আমদানি বৃদ্ধি: গত বছরের তুলনায় গড়ে ৪০% বেশি (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে)।
  • খেজুর শুল্ক হ্রাস: ২৫% থেকে ১৫%-এ নামানো হয়েছে।
  • প্রধান পণ্য: খেজুর, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল, চিনি, গম—সবকিছুর সরবরাহ স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) আবারও স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এবার ভরিতে ১ হাজার ৫৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৯১ টাকা। এটি দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ মূল্য, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় চাহিদা এই বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ।

বাজুসের এই সিদ্ধান্ত গতকাল (২৪ জানুয়ারি) থেকে কার্যকর হয়েছে। সংগঠনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে এই সমন্বয় করা হয়েছে। গত কয়েক মাসে স্বর্ণের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, যা দেশের অর্থনীতি এবং ক্রেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বিবাহের মৌসুমে এই বৃদ্ধি অনেক পরিবারের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। বাজুসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দাম নির্ধারণে স্থানীয় বাজারের চাহিদা-যোগান এবং আমদানি খরচও বিবেচনা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এই দামবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর শেয়ারবাজারে পতন দেখা গেছে, যার ফলে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশে স্বর্ণের আমদানি মূলত ডলারের মাধ্যমে হয়, এবং টাকার অবমূল্যায়নও এই খরচ বাড়িয়েছে। ফলে, স্থানীয় জুয়েলার্সরা দাম না বাড়িয়ে লোকসানের মুখে পড়ছিলেন।

দেশের স্বর্ণবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এক বছরে দামবৃদ্ধির হার অভূতপূর্ব। ২০২৫ সালের শুরুতে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যা ধীরে ধীরে বেড়ে ২ লাখ ছাড়িয়েছে। গত অক্টোবরে এটি ২ লাখ ১৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছিল, এবং ডিসেম্বরে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার হয়। এবারের বৃদ্ধি সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে। বাজুসের তথ্য অনুসারে, গত পাঁচবারের দাম সমন্বয়ে তিনবারই বাড়ানো হয়েছে, যা বাজারের অস্থিরতা নির্দেশ করে।

এই দামবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের উপর। বিবাহ, উৎসব এবং বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কেনা অনেকের জন্য এখন বিলাসিতা হয়ে উঠেছে। জুয়েলার্সরা জানিয়েছেন, চাহিদা কমলেও দামের চাপে বিক্রি কমছে না, কারণ স্বর্ণকে এখনও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। তবে, ছোট ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন যে, এই অস্থিরতা তাদের ব্যবসা অস্থিতিশীল করে তুলছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বর্ণের দামবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।