জ্বর এলে কিংবা শরীরের কোনো অংশে ব্যথা অনুভূত হলেই হাতের নাগালে রাখা প্যারাসিটামলের প্যাকেটটির দিকেই প্রথম হাত বাড়ায় আমরা। সহজলভ্যতা আর অল্প দামের এই ওষুধটি এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে অনেকেই একে ‘নিরীহ’ ভেবে বসেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি নিরাপদ এবং ওভার-দ্য-কাউন্টার (চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায়) ওষুধ হলেও, সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের সতর্কবাণী বলছে ভিন্ন কথা। অজান্তেই এই সাদা ট্যাবলেটের প্রতি আমাদের নির্ভরতা তৈরি করছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যার সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে আমাদের যকৃৎ (লিভার)।

রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালের লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. আসিফ মাহমুদ জানান, গত কয়েক বছরে অজানা কারণে লিভার সিরোসিস বা লিভার বিকল হওয়ার যে রোগী বাড়ছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই প্যারাসিটামলের দীর্ঘমেয়াদী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “প্যারাসিটামল একটি বিষ, যেমন অন্য সব ওষুধই। শরীরে প্রবেশের পর এর উপাদানগুলি লিভারে গিয়ে বিপাক (মেটাবলাইজ) হয়। প্রতিবার ওষুধ খাওয়ার সময় লিভারের ওপর একটু চাপ পড়ে। কিন্তু নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি গেলে এই চাপ লিভারের কোষ ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

সাধারণ মানুষের মধ্যে প্যারাসিটামলকে ঘিরে যে কয়টি ভুল ধারণা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে প্রধানটি হলো—‘প্যারাসিটামলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, যত খুশি খাওয়া যায়’। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক প্যারাসিটামল সেবনের সর্বোচ্চ নিরাপদ মাত্রা সাধারণত ৩ থেকে ৪ গ্রাম (প্রতি ৫০০ মিলিগ্রামের ৬ থেকে ৮টি ট্যাবলেট)। এই মাত্রা অতিক্রম করলেই ঝুঁকি শুরু হয়।

অনেকের ধারণা, একবারে একটু বেশি মাত্রায় বা অল্প সময়ের মধ্যে ঘন ঘন ওষুধ খেলে জ্বর বা ব্যথা দ্রুত সারে। চিকিৎসকদের মতে, এটি একেবারেই ভুল ধারণা। ওষুধের একটি নির্দিষ্ট কার্যকারিতা মাত্রা আছে; এর বেশি গেলে তা জ্বর কমাতে সাহায্য না করে উল্টো লিভারকে ধীরে ধীরে বিকল করে তোলে।

আরেকটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে কিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, খালি পেটে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে এবং এর কার্যকারিতার কোনো তারতম্যও হয় না। তবে যারা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য খাবার পরে খাওয়াই বেশি নিরাপদ। তাছাড়া ‘প্যারাসিটামলের সঙ্গে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া জরুরি’—এটিও একটি ভুল ধারণা। প্যারাসিটামল সাধারণত পাকস্থলিতে এসিডিটি বা ঘা সৃষ্টি করে না; এসব সমস্যা করে অন্যান্য ব্যথানাশক যেমন আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা ন্যাপ্রোক্সেন-জাতীয় ওষুধ।

অনেক সময় জ্বর বা ব্যথা না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই একসঙ্গে একাধিক ওষুধ খেয়ে ফেলেন রোগীরা। কিন্তু কিছু কিছু ওষুধ আছে যা প্যারাসিটামলের সঙ্গে খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

চিকিৎসকরা জানান, যক্ষ্মা (টিবি) বা মৃগীরোগের ওষুধ (যেমন- ফেনাইটোইন, কার্বামাজেপিন) যারা দীর্ঘমেয়াদে খাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামলের বিষাক্ত প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। এসব ওষুধ লিভারের এনজাইমগুলোর কার্যকারিতা বদলে দেয়, ফলে প্যারাসিটামলের উপাদান লিভারে গিয়ে জমতে থাকে এবং সহজে ভাঙতে পারে না। ফলে অল্প মাত্রার প্যারাসিটামলও লিভারের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এছাড়া যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন, তাদের জন্যও প্যারাসিটামল অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ মদ্যপানের ফলে যে লিভার আগে থেকেই দুর্বল, সেখানে প্যারাসিটামলের বিষাক্ত প্রভাব কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ রেমিট্যান্স যেন নতুন উচ্চতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাস ও এগারো দিনে (জুলাই-১১ মার্চ) প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র।

মার্চের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহে যেন জোয়ার এসেছে। ১ থেকে ১১ মার্চ মাত্র ১১ দিনে দেশে এসেছে ১৯২ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের (১৩৩ কোটি ডলার) তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। আর ১১ মার্চ একক দিনেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার— যা একদিনের রেমিট্যান্স আদায়ের হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের এই অগ্রগতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ। গত অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই-মার্চ) রেমিট্যান্স ছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি ডলার। সেই তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার চোখে পড়ার মতো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার মধ্যেও প্রবাসীরা বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা রেখেছেন। ডলারের দাম বাড়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো এখন আগের চেয়ে বেশি লাভজনক, যা এই প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, “বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীরা এখন আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন সহজ হয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সম্প্রসারণ রেমিট্যান্স প্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর প্রচেষ্টা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে প্রবাসীরা এখন আগের চেয়ে কম সময়ে, কম খরচে দেশে টাকা পাঠাতে পারছেন।”

মার্চের প্রথম ১১ দিনে ১৯২ কোটি ডলার আসার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের আগে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে প্রবাসীরা বেশি করে টাকা পাঠান, যা মার্চ-এপ্রিলে রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বগতি নিশ্চিত করে। ২০২৫ সালের মার্চেও ১১ দিনে ১৩৩ কোটি ডলার এসেছিল; এবার সেই অঙ্ক ৪৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ২৪৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। মার্চের প্রথম ১১ দিনে যোগ হয়েছে আরও ১৯২ কোটি ডলার। ফলে মোট রেমিট্যান্স এখন ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এই গতি অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

টানা দেড় দশক পর সংসদে প্রকৃত বিরোধী দলের উপস্থিতি। রক্তঝরা পথ বেয়ে ফিরে পাওয়া গণতন্ত্রের এই প্রথম অধ্যায়। বেলা ১১টার পর পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শেষে মাইকে ভেসে এল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনে তিনি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ালেন— ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে দিলেন এক অবিস্মরণীয় ভাষণ।

স্পিকারের চেয়ার শূন্য রেখেই শুরু হয় এই ঐতিহাসিক সংসদ অধিবেশন । আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় সাময়িক সভাপতির দায়িত্ব পান কুমিল্লা-২ আসনের প্রবীণ সাংসদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন । আর তার আগেই বেলা ১১টা ৫ মিনিটে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী ।

ভাষণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের অমর সব শহীদের। তিনি বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে দেশ ও মানুষকে বাঁচানোর আন্দোলন— এ পর্যন্ত সব শহীদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।”

তার কণ্ঠে ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিহত অসংখ্য তরুণ-শিক্ষার্থীর স্মৃতিচারণ। তিনি স্মরণ করেন, যারা এই সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য নিজের চোখের জল, সন্তানের রক্ত আর স্বজন হারানোর বেদনাকে মাথায় নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন । বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে, সেই ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিটি শহীদের প্রতি রইল সশ্রদ্ধ সালাম।”

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির রূপকার হিসেবে খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই শুভ মুহূর্তে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি দেশরত্ন বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি আজীবন ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি, গণতন্ত্রের জন্য লড়ে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।”

তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দেশে গণতন্ত্রের নামে ‘কবরস্থান’ তৈরি হয়েছিল। আইনসভাকে বানানো হয়েছিল ‘ক্লাব’ আর সংসদ সদস্যদের বানানো হয়েছিল ‘ভোটে না জেতা মনোনীত প্রতিনিধি’ । সেই অন্ধকার কেটে আজ আবারও ফিরে এসেছে ‘জনগণের সংসদ’।

বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, “আমাদের দল, মত, কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ফ্যাসিমুক্ত, পরাধীনতামুক্ত, নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না।”

তিনি সংসদকে সব সমস্যার সমাধানকেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা চাই এই সংসদ হোক যুক্তিপূর্ণ আলোচনা, গঠনমূলক বিতর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ইতিহাসের পাতা খুলল লড়াকু এক কণ্ঠে। বৃহস্পতিবার বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। একাত্তরের রণাঙ্গনের সেই সেনাপতি এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ আসনে।

স্পিকার পদে তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং তা দ্বিতীয় করেন খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম ।

বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সংসদের পথচলা ।

কিন্তু শুরুতেই ছিল না স্পিকার। ফলে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ও কুমিল্লা-২ আসনের সাংসদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, যাকে সাময়িক এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

স্পিকার শূন্য থাকায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সংসদে স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। তিনি জানান, স্পিকার পদে একটিমাত্র মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম ঘোষণার পর তা করতালির মধ্য দিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।

একই সঙ্গে নেত্রকোনা-১ আসনের তরুণ সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। তার নাম প্রস্তাব করেন হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং সমর্থন করেন হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান ।

দুই শীর্ষ পদে নির্বাচন শেষে বিরতি দেয়া হয় সংসদের। পরে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কক্ষে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সিনিয়র মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন এই স্পিকারের রক্তে মিশে আছে। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভের পর ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার যুদ্ধে। চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও কামালপুরের যুদ্ধে তার বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পান তিনি।

সেনাবাহিনীর মেজর থেকে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেন আশির দশকের মাঝামাঝি। ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসন থেকে টানা ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন  সর্বশেষ তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী।

শুধু সেনা কর্মকর্তা বা রাজনীতিক নন, তিনি এক সময়ের জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলারও। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে ঢাকা লিগ জয় এবং পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করার গৌরব আছে তার ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও কঠোর শৃঙ্খলার সমন্বয়ে নতুন সংসদ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দীর্ঘ সাংসদিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনের নানা স্তরে কাজ করার কারণে সংসদীয় প্রক্রিয়া তার কাছে খুব স্পষ্ট।

স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রতি আশা প্রকাশ করে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, “আমরা চাই ১৩তম সংসদ হোক কার্যকর ও গতিশীল। স্পিকার সাহেবের নেতৃত্বে তা সম্ভব হবে।

আনন্দের কাফেলা ফিরছিল বিয়েবাড়ি থেকে। সঙ্গে ছিল স্বপ্ন, ছিল আগামীর পথচলার পরিকল্পনা। কিন্তু নিয়তি বোধহয় সেদিন অন্য খেলা খেলছিল। বাগেরহাটের রামপালে মাইক্রোবাস ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ১৩ জনসহ ১৪ জন নিহত হওয়ার মর্মান্তিক খবরে গোটা অঞ্চল শোকে স্তব্ধ। খুন হয়ে গেল বরযাত্রীর গান; বর আর কনের বদলে বাড়ি ফিরল লাশ।

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার গুনাই ব্রিজ এলাকায় এই প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। তারই প্রিয় ছেলে সাব্বিরের বিয়ের পাণিগ্রহণ শেষে বাড়ি ফিরছিল গোটা পরিবার।

জানা যায়, আব্দুর রাজ্জাক বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলায় তার ছেলে সাব্বিরের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাতে দীর্ঘক্ষণ বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরের পর একটি মাইক্রোবাস ও একটি প্রাইভেটকার ভরে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। ১৫ আসনের মাইক্রোবাসটিতে ছিলেন বর সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই জনি, আব্দুল্লাহ, আল-আমিন, বোন ঐশি, তিন ভাইয়ের স্ত্রী, বোনের মেয়ে, মেয়ে জামাই এবং নাতি-নাতনিসহ মোট ১৫ জন।

পথে আনন্দ-ফুর্তিতে কেটেছে সময়। কিন্তু গুনাই ব্রিজ পেরোনোর সময় হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে মাইক্রোবাসটি। দ্রুতগামী একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে এর প্রচণ্ড মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ধাক্কার তীব্রতায় মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ১১ জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও তিনজন।

দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকা দীর্ঘ ও বেদনার্ত। বর সাব্বির (২৫), তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৬০), মা সাহিদা বেগম (৫৫), ভাই জনি (২২), আব্দুল্লাহ (২০), আল-আমিন (১৮), বোন ঐশি (১৬), সাব্বিরের স্ত্রী (নববধূ) সাথী (২২), ভাইয়ের স্ত্রী রুমা (২৫) ও শিউলি (২২), বোনের মেয়ে নুসরাত (৯) এবং মেয়ে জামাই নুরে আলম সিদ্দিকী (৩৫)। এছাড়া মাইক্রোবাসের চালক সোহাগও নিহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাস থেকে ছিটকে পড়ে থাকা লাল টুকটুকে বরের পোশাক আর কনের চুড়ি দেখে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায় সবার। বিয়ের আনন্দের কোনো চিহ্ন সেখানে ছিল না; শুধু ছিল কান্না আর হাহাকার।

রামপাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজ চালায়। মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো এলাকা স্তব্ধ। মোংলা-খুলনা মহাসড়কের এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে পরিচিত। স্থানীয়রা বলছেন, সড়কের প্রশস্ততা ও চলাচলকারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।

মোংলা পোর্ট পৌরসভার মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, “একটি পরিবারের ১৩ জন সদস্য একসঙ্গে চলে যাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এই শোক যেন সত্যিই অসহ্য।” নিহত ১৪

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম টেলিভিশন ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তেহরান থেকে প্রচারিত এই ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানান, ইরান তার পথ থেকে বিচ্যুত হবে না এবং শহীদ কাসেম সোলেইমানি থেকে শুরু করে সম্প্রতি নিহত সকল শীর্ষ সামরিক কমান্ডারের রক্তের বদলা নেওয়া হবে।

প্রবীণ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন তার পুত্র মোজতবা খামেনি। এই রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি। ভাষণের শুরুতেই মোজতবা খামেনি একটি ঐতিহাসিক দলিল উদ্ধৃত করে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য এখন আর পুরোনো ভৌগোলিক মানচিত্রে আবদ্ধ নয়; এটি এখন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে বিশ্বাস আর শক্তির লড়াই চলছে।”

আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি তার ভাষণে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (Axis of Resistance) কে বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “ইয়েমেনের জনগণ, ইরাকের প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ কেবল কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়; তারা ইসলামি বিপ্লবের সামনের সারির সৈনিক।” তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলেই এই গোষ্ঠীগুলোকে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হবে।

ভাষণে তিনি ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারে। বাব এল-মান্দেব প্রণালী শুধু বাণিজ্যের পথ নয়, এটি আমাদের শক্তির প্রতীক।” বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কথা মাথায় রেখেই এই মন্তব্য করেছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রসঙ্গে মোজতবা খামেনির বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট ও কঠোর। তিনি বলেন, “ইরান তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে চায়, কিন্তু এই অঞ্চলের মাটিতে যদি কোনো বিদেশি শক্তি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে সেই ঘাঁটি আমাদের জন্য বৈধ লক্ষ্যে পরিণত হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “গত কয়েক দশকে আমরা দেখিয়েছি, আমরা হুমকি দিতে বিশ্বাসী নই; আমরা কাজ করতে বিশ্বাসী। মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা কেবল অব্যাহত থাকবে না, বরং তা আরও তীব্র হবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির এই ভাষণ প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক সতর্কবার্তা। তিনি তার পিতার কঠোর লাইন অনুসরণ করলেও ভাষাভঙ্গি ও উপস্থাপনায় তাকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব বিস্তারের যে কৌশল, তা ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।মোজতবা খামেনি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পথচলা শুরু হচ্ছে আগামীকাল। বুধবার (১১ মার্চ) বেলা ১১টায় গণভবনে বসছে প্রথম অধিবেশন। এই অধিবেশনেই সংসদের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে—একই দিনে নির্বাচিত হবেন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার। তাদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন।

সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন এই অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সরকারের শীর্ষস্থানীয় এক মন্ত্রী।

বুধবার দুপুরে সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সংসদের বিধি অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের নবগঠিত কক্ষে ভাষণ দেবেন এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকার ও তার ডেপুটিকে শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। বেলা ১১টায় শুরু হবে। সেদিনই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি মহোদয় তাদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। সংসদের বিধি অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।” তিনি আরও জানান, প্রথম অধিবেশনে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে। যদিও সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।

**নতুন অধিবেশন, নতুন মাত্রা:**
ত্রয়োদশ সংসদের এই প্রথম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদটি শুধু সাংবিধানিক পদ নয়, বরং সংসদের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার প্রতীক। বিগত সংসদগুলোতে স্পিকার নির্বাচন কখনও কখনও দীর্ঘসূত্রিতা ও নাটকীয়তা দেখেছে। কিন্তু এই প্রথমবারের মতো একই দিনে দুটি পদে নির্বাচন ও শপথ গ্রহণের ঘটনা সংসদীয় ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করল।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে স্পিকার পদে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, যা প্রতিপক্ষের জন্যও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। ডেপুটি স্পিকারের পদটি সাধারণত সংসদের নিম্নকক্ষের স্বাভাবিক কার্যক্রম সঞ্চালনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমেই এই পদে কে আসছেন, তা নির্ধারিত হবে বলে ধারণা করছেন সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।

রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের শপথ বাক্য পাঠ করানোর মাধ্যমে সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার প্রথা থাকলেও প্রথম অধিবেশনেই এই আয়োজন বিরল। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি চাইলে সংসদে ভাষণ দিতে পারেন। তবে আগামীকালের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন কিনা, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে মুক্ত ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। ফ্যাসিবাদী চরিত্রের মতো সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি সকল রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বুধবার রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) আয়োজিত ইফতার ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পেশাজীবী সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত এই মিলনমেলায় মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর আর যেন ফ্যাসিস্টদের মতো চড়াও না হই, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মুক্ত গণমাধ্যম সবার প্রত্যাশা।” তার এই মন্তব্যে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের ওপর হওয়া নানা ধরনের নিপীড়নের ইতিহাসের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বাংলাদেশকে একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করার অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিতব্য সংসদীয় অধিবেশনকে ‘ইতিহাসের অংশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “আগামীকাল ইতিহাস রচিত হতে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সংসদ বসছে।” এ সময় তিনি আগামী দিনের রাজনীতিতে এই সংসদকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন চর্চা এবং আইনসভার কার্যকর ভূমিকা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন গত ১৭ বছরে সাংবাদিকদের ওপর হওয়া নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ সাড়ে সতেরো বছর অনেক সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতি যেন ভবিষ্যতে আর কখনো না হয়, সেদিকে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।” তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের প্রতিও এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তাগিদ দেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিইউজে সভাপতি ও বিএফইউজে’র সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। এ সময় তারা পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি বেশ কিছু দাবি জানান। সাংবাদিক নেতারা বলেন, শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বাস্তবক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর যেকোনো ধরনের হামলার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি তীব্র বক্তৃতা চলছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সাংবাদিকের ওপর হামলা, সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ‘ফ্যাসিস্টদের মতো চড়াও’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তিনি অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের প্রবণতাকে পরোক্ষভাবে তিরস্কার করেছেন।

মন্ত্রী ও সমাজকল্যাণমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সামনের দিনে সরকার সাংবাদিকদের জন্য আরও সুরক্ষিত পেশাগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই বক্তব্য বাস্তবে রূপ নেয় কিনা, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতে কোনো সাংবাদিক সংকটে পড়লে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সংসদীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পশ্চিম ব্লকে শুরু হওয়া এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে সরকারদলীয় সব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র সদস্যরা অংশ নেন। সূত্রমতে, বৈঠকে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, আগামী বাজেটকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রস্তুতি এবং নিজ নিজ সংসদীয় এলাকায় সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে এমপিদের আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমাদের আরও নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রতিটি এমপিকে নিজ এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।” তিনি মন্ত্রী ও এমপিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সংসদের চলতি অধিবেশনের জন্য নতুন করে সময়সূচী নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদ বসার পর টানা দুই দিন (শুক্রবার ও শনিবার) বিরতি দিয়ে ১৫ মার্চ (রোববার) পুনরায় সংসদ বসবে। ওই দিনের অধিবেশন শেষে আবার বিরতি দিয়ে ২৯ মার্চ পরবর্তী অধিবেশন শুরু হবে।

এই সিদ্ধান্তকে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিরতির সময়গুলোতে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি করতে পারবেন বলে মনে করছে সরকার দল।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন সর্বকালের সর্বোচ্চ সীমা ছুঁই ছুঁই করছে, তখন তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও। কিন্তু স্বাভাবিক চিত্রের উল্টো চিত্র দেখা গেছে দেশের মানুষের আচরণে।

সংকটের এই সময়ে সাশ্রয়ী না হয়ে বরং জ্বালানি তেলের চাহিদা ও মজুত বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গত মাসের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় চলতি মাসে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রি বেড়েছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও সংশ্লিষ্ট বিপণন কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে জ্বালানি তেলের চাহিদা কম থাকে। কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। সারাদেশের পাম্প ও ডিপোগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুম শেষ হতে চললেও ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। অকটেন ও পেট্রোলের বিক্রিও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় সরকার দেশের বাজারেও দাম বাড়াবে—এই আশঙ্কা থেকেই এই কৃত্রিম মজুতের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবহারকারী সবাই ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে এই ভয়ে এখনই বেশি করে তেল কিনে মজুত করছেন। বিপিসি এই অবস্থাকে ‘প্যানিক ডিমান্ড’ বা আতঙ্কের চাহিদা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাজারে সরবরাজ স্বাভাবিক আছে। আমরা পর্যাপ্ত মজুত রেখেছি। কিন্তু মানুষ যেভাবে আতঙ্কিত হয়ে তেল কিনছে, তাতে সাময়িকভাবে কিছু পাম্পে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এটি সম্পূর্ণ মানসিক একটি বিষয়। এই প্যানিক কেটে গেলে পরিস্থিতি নিজে থেকেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”

জ্বালানি তেলের বাজারে এই কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি। গত দুদিনেই চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে তিনটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ। এতে এসেছে প্রায় ৮৫ হাজার টন ডিজেল। ইতিমধ্যে একটি জাহাজ থেকে ডিজেল খালাস শুরু হয়েছে। বাকি দুটি জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, সামনের দিনগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আরও জাহাজ আসার কথা রয়েছে। বন্দরে জাহাজ জট ও খালাস প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না। পাশাপাশি সারাদেশের ডিপোগুলোতে তেলের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। কোনো ধরনের সংকট তৈরি হতে দেওয়া হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছে সংস্থাটি।